ফিচার
Published : 03 Feb 2026, 05:20 PM
মতামত
সভ্যতা এগিয়েছে অনেকটা পথ। আমরা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কথা বলি, মঙ্গলে বসতি গড়ার স্বপ্ন দেখি। কিন্তু সম্প্রতি জেফরি এপস্টাইন মামলার গোপন নথিগুলো যখন একে একে উন্মোচিত হচ্ছে, তখন মনে হয় আমাদের মনের ভেতরকার সেই অন্ধকার আদিম গুহাটি আজও ঠিক আগের মতোই অন্ধকার রয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আজ ফুঁসে উঠেছে, চায়ের টেবিল থেকে শুরু করে ডিজিটাল ওয়াল—সবখানে একটাই চর্চা। কিন্তু এই শোরগোলের নেপথ্যে কি কেবল নতুন কোনো গল্প শোনার আগ্রহ? নাকি এটি হাজার বছরের পুরনো এক নির্লজ্জতার পুনরাবৃত্তি?
মানুষ যেদিন থেকে মানুষকে পণ্য করতে শিখেছে, যেদিন থেকে দুর্বলের ওপর সবলের আধিপত্যকে 'অধিকার' হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছে, এই বিকৃতির জন্ম সেদিন থেকেই। দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়েছে বলে আমরা যে বড়াই করি, এপস্টাইনের 'আইল্যান্ড' বা তার ব্যক্তিগত বিমান 'ললিতা এক্সপ্রেস' প্রমাণ করে যে, দাসপ্রথা মরে যায়নি; বরং তা রাজপ্রাসাদ আর আধুনিক পেন্টহাউসের ড্রয়িংরুমে নতুন মোড়কে ঢুকে পড়েছে। ক্ষমতার জোরে অন্য মানুষের শরীর আর আত্মাকে পণ্য বানানোর এই যে আদিম আসক্তি, তা কোনো আধুনিক আইন বা নীতি দিয়ে আজও নিরাময় করা যায়নি। মুখোশের আড়ালে যারা নথিতে নাম আসা ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিল গেটস বা প্রিন্স অ্যান্ড্রুদের মতো ব্যক্তিদের ঘিরে মিডিয়া যে তোলপাড় করছে, তার কারণ এদের 'ইমেজ'। দিনের আলোয় যারা বিশ্ব পরিবর্তনের কথা বলেন, জলবায়ু সংকট নিয়ে চিন্তিত হন কিংবা গণতন্ত্রের ছবক দেন, রাতের অন্ধকারে তারাই যখন এমন এক চক্রের সাথে যোগাযোগ রাখেন, তখন মানুষের বিশ্বাসে ফাটল ধরা স্বাভাবিক। বিল গেটস যখন একে 'ভুল' বলেন, কিংবা ট্রাম্প যখন দূরত্ব বজায় রাখার দাবি করেন, তখন প্রশ্ন জাগে—তবে কি এই প্রভাবশালীরা জানতেন না পর্দার আড়ালে কী ঘটছে? নাকি তারা জেনেও সেই অন্ধকারকে উপভোগ করেছিলেন?
অনেকে একে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বলছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যখন ক্ষমতা আর অর্থ এক বিন্দুতে মিলিত হয়, তখন আইন সেখানে অন্ধ হয়ে যায়। এপস্টাইনের রহস্যজনক মৃত্যু আর প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দায়মুক্তি এই সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দেয় যে, এই গোলকধাঁধাটি সাধারণ মানুষের চিন্তার চেয়েও অনেক বেশি গভীর। এটি কেবল একজন এপস্টাইনের লালসার গল্প নয়, এটি একটি পদ্ধতিগত পচনের গল্প—যেখানে মানুষ আজও স্রেফ কেনাবেচার সামগ্রী। সভ্যতার লজ্জা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আজ যে হাহাকার, তা আসলে আমাদের সম্মিলিত পরাজয়ের শব্দ। আমরা এমন এক বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করেছি যেখানে ওপরতলার মানুষরা এক অলিখিত 'আইনি কবচ' নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আপনি যদি ধনী হন, আপনার হাতে যদি ক্ষমতা থাকে, তবে আপনি আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধ করেও বছরের পর বছর পার পেয়ে যেতে পারেন—এটাই আজকের কঠোর সত্য।
জেফরি এপস্টাইন আমাদের নতুন কোনো সত্য শোনাননি, বরং আমাদের দীর্ঘদিনের নির্লজ্জতাকে আয়নায় দেখিয়ে দিয়েছেন। যেদিন থেকে মানুষ মানুষকে বিক্রি করতে শিখেছে, সেই আদিম অন্ধকার আজও আমাদের ভেতরে একইভাবে সচল। পার্থক্য শুধু একটাই—আগে বিকৃতি ছিল নগ্ন, আর এখন তা সুটেড-বুটেড এবং আভিজাত্যের মোড়কে আবৃত। যতদিন পর্যন্ত ক্ষমতার এই অন্ধ অলিগলি বন্ধ না হবে, ততদিন জেফরি এপস্টাইনরা বারবার ফিরে আসবে ভিন্ন নামে, ভিন্ন পোশাকে।
তথ্য ও ছবি: ইন্টারনেট
Add a Comment