ফিচার
Published : 02 Feb 2026, 08:23 AM
বয়স তখন বোধহয় সাড়ে চার! থাকতাম মির্জাপুরে। ভারতেশ্বরী হোমসের পাশেই আমাদের বাসা। একদিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেলো গানের সুরে- আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি। জানালা দিয়ে উঁকি দিলাম। সাদা শাড়ি কালোপাড়ের মেয়েরা খালি পায়ে গান গাইতে গাইতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। মুখে এক ধরনের বিষাদ। কেউ কোনো দিকে তাকাচ্ছেন না। যেন মগ্ন নিজের মধ্যে। দৃশ্যটি গেঁথে আছে মাথায়। বাবা বললেন, প্রভাত ফেরি যাচ্ছে। বড় হয়ে জানলাম প্রভাত ফেরির মাহাত্ম্য।
বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, ফেব্রুয়ারির শিশিরভেজা ভোরে যখন চারদিকে প্রতিধ্বনিত হয়— "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি", তখন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগে। খালি পায়ে, হাতে একগুচ্ছ ফুল নিয়ে ধীরলয়ে শহিদ মিনারের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এই যে যাত্রা, এরই নাম ‘প্রভাত ফেরি’। এটি কেবল একটি মিছিল নয়, বরং এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, শোক আর দ্রোহের এক জীবন্ত ইতিহাস।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের পর ১৯৫৩ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি থেকে প্রভাত ফেরির এই রীতিটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। সেই বছরই প্রথম ভোরে সাধারণ মানুষ খালি পায়ে শোকসংগীত গেয়ে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে রাজপথে নামে। ১৯৫৩ সালের সেই দিনটি থেকেই ভোরে মিছিল করে শহিদ মিনারে গিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা বাঙালির একটি বার্ষিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়। সময়ের সাথে সাথে এটি কেবল একটি রাজনৈতিক বা সামাজিক কর্মসূচি না থেকে হয়ে ওঠে সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
শব্দ থেকে সংস্কৃতি: যেভাবে হলো উত্তরণ:
'প্রভাতে' যে 'ফেরি' বা প্রদক্ষিণ করা হয়, শাব্দিক অর্থে তাই প্রভাত ফেরি। কিন্তু বাঙালির কাছে এর অর্থ আরও গভীর।
প্রভাত ফেরির মূল ভিত্তি হলো বিনম্র শ্রদ্ধা। সাদা-কালো পোশাক, বুকে কালো ব্যাজ আর খালি পা— এই সবকিছুই শোকের প্রতীক। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে বিনম্র চিত্তে পূর্বপুরুষের আত্মদানকে সম্মান জানাতে হয়।
আব্দুল গাফফার চৌধুরীর কথা ও আলতাফ মাহমুদের সুরে কালজয়ী গান "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো..." প্রভাত ফেরিকে দান করেছে এক অনন্য আধ্যাত্মিকতা। এই গানটি ছাড়া প্রভাত ফেরি অপূর্ণ। সুরের মাধ্যমেই এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিটি বাঙালির ঘরে ঘরে।
দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষ যখন একই কাতারে দাঁড়িয়ে শহিদ মিনারের দিকে এগিয়ে যায়, তখন প্রভাত ফেরি হয়ে ওঠে জাতীয় সংহতির প্রতীক।
১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর প্রভাত ফেরি বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়। আজ কেবল বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিরা এবং বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ এই প্রভাত ফেরির আদলে নিজ নিজ ভাষা ও শহিদদের স্মরণ করে। ফলে প্রভাত ফেরি এখন বাঙালির সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক সংস্কৃতির অংশে পরিণত হয়েছে।
প্রভাত ফেরি আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের শেকড়ের কথা, আমাদের ভাষার কথা। এটি আমাদের শেখায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে এবং নিজের সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে। যতক্ষণ পর্যন্ত পৃথিবীতে বাংলা ভাষা থাকবে, ততক্ষণ প্রভাত ফেরি বাঙালির অহংকার এবং চেতনার বাতিঘর হয়ে টিকে থাকবে। শহিদ মিনারের পথে হাঁটা সেই প্রতিটি পদক্ষেপ আসলে আমাদের অস্তিত্বের দিকেই এগিয়ে যাওয়া।
Add a Comment