লিটমুড
Published : 24 Jan 2026, 06:23 AM
চন্দ্রালোকে অথবা ঘোর অমাবশ্যায় যে-সকল দূরপাল্লার পাখিরা সমুদ্রের উপর দিয়ে উড়তে শুরু করেছিল, তাদের চিহ্নহীন উড়াল-পথে দূরের নক্ষত্ররাজি ইঙ্গিত করে-করে পাখিদের পৌঁছে দেয় হাজার মাইল দূরের অচেনা উপত্যকায়। নক্ষত্রের ইশারা মানুষ বুঝতে পারে না; মানুষ কবি হয়ে উঠলে ধারণ করে পাখির পরাণ। অতঃপর যাত্রা শুরু হয় কবিতার পথে।
সমাজবদ্ধ মানুষ কবিতার পথে যাত্রা করে- এ বড় অত্যাশ্চর্য ঘটনা। কবিতার যাত্রাপথ সুশৃঙ্খল ও সুনির্দিষ্ট না হয়েও শিল্পের অন্যান্য শাখার চেয়ে কবিতা নিয়েই সর্বাধিক আলোচনা হয়েছে সর্বকালে। কবিতা যেহেতু ধ্যানের ধ্র“পদ প্রকাশের সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম সেহেতু একটি বিশুদ্ধ কবিতায় অনেকার্থদ্যোতক যতিচিহ্নটিও নিবিড় অনুভব ও আলোচনার দাবি রাখে। একটি সার্থক কবিতার যতিচিহ্নের সাথে ছোট ছোট ডিঙি নাওয়ের নোঙর (ছিংলার নোঙর, খুঁটির নোঙর) এর সাদৃশ্য অনুভব করা যেতে পারে। ক্রন্দনরত শিশুর কপালের ভাঁজ কিংবা বয়স্ক বৃক্ষের চামড়া অথবা প্রাজ্ঞজনের মুখের বলি-রেখার সাথেও যতিচিহ্নের দৃশ্যগত মিল আছে। মৃত্যুবরণের পূর্বমুহূর্তে একদম বাতাস ধরতে-যাওয়া মানুষটির মুখে অসংখ্য চিহ্ন ফুটে ওঠে, যা একটি বৈদগ্ধপূর্ণ কবিতার যতিচিহ্ন সদৃশ। নির্দিষ্ট পাঠক লেখকের অনুভূতি অতিক্রম করে গেলে প্রকৃত রচনায় সার্থকতা আসে। কবতিায় বহুমাত্রকি প্রাণারোপরে জন্য কবরি অনুভূতি অতক্রিম করতে হয় পাঠকক।ে ধ্যানের সর্বোচ্চ ধ্রুপদ প্রকাশের মাধ্যমে এ-পথটিও তৈরি করতে হয় একজন কবিকে। কবিতা শাশ্বত হলে তড়পে-ওঠা তরুর কান্নাও পাঠকের কাছে দৃশ্যমান হয়।
একসময় নের্ভাল এর কবিতা পড়ে ভীষণ পুলকিত হয়েছিল বোদলেয়ার। এ-তো নিজেরই কথা নের্ভাল রচনা করেছেন। তিনি কেন নিজে লিখেননি এ কবিতাগুলো? ফ্লুর দ্য মাল- এর মতো বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের জনক হয়েও নের্ভালের প্রতি বোদলেয়ারের দুর্বলতা কমেনি। মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে বোদলেয়ার যখন বাক্যহারা, হেসে উঠেন হো হো করে- কখনও প্রীত হতে শিখিনি/আমার আছে শুধু অট্টহাসি- তখনও তিনি নিজেকে কল্পনা করেন প্রিয় কবি নের্ভাল হিসেবে।
মানুষের স্নায়ু ও প্রবৃত্তির ব্যাখ্যায় পঞ্চইন্দ্রিয় বিশ্লেষিত হওয়া জরুরী হলে ইন্দ্রিয় ঘনিষ্ঠ রং, বর্ণ , সংকেত, গন্ধ ইত্যাদি হতে শুধুমাত্র রঙই চিহ্নিত ও সনাক্ত করা যায় বিভিন্নভাবে।
আজ এই ক্রমনগরায়ণের যুগে নির্জনতা বিষয়ে বোদলেয়ারের উক্তিটি স্মরণ করা যেতে পারে- তুমি যদি না-জানো কী করে নির্জনতাকে ভরে তুলতে হয় মানুষে, তবে তুমি জানবে না কী করে জনতার মধ্যে একাকী হতে হয়।
এইসব কবিতার অনুবাদ প্রায়-অসম্ভব; আবার প্রতিটি কবিতাই অনুদিত কবিতা। এই সাংঘর্ষিক উক্তির সরলীকরণ হল-যেহেতু একটি কবিতা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বতন্ত্র সত্ত্বা বহন করে, ভাষিক পরিবর্তনের মাধ্যমে আত্মার ভাষান্তর বিষয়ী (অনুবাদক) কর্তৃক সম্পাদিত হলে পৃথক আত্মা জন্মলাভ করে অথবা মৌলিক আত্মার আংশিক বা বিকলাঙ্গ ভাবান্তর ও ভাষান্তর হয়।
প্রকৃতি, ব্যক্তি, দৃশ্য, অদৃশ্য নির্বাচন করে বিষয়ী (কবি) যে সকল রুহের জন্মদান করেন, সে ক্ষেত্রে ভাষাবদ্ধ কবি (কবি যেহেতু জৈব-মানুষ; ভাষিক, স্থানিক ও কালিক মানুষ) পূর্বপুরুষসৃষ্ট নির্দিষ্ট ভাষায় রুহের অস্তিত্বদান করেন অথবা শব্দের মাধ্যমে রুহের অনুবাদ করেন। সার্থক কবি মাত্রই প্রকৃতির উপযুক্ত অনুবাদক।
রুহের জন্ম বা আত্মজন্মের কথা মানুষের মনে থাকে না, মানুষের জরায়ন-স্মৃতি নেই বলে। সসীম মানুষের রুহের জন্মোৎসবের চেয়ে রুহের প্রস্ফুটন ও অস্তিত্বের গভীর বিশ্লেষণ সৌন্দর্যবিজ্ঞান স্পর্শ করে বলে মানুষের রুহের কাকুতি, কুহক বিভ্রম, গহন মান-অভিমান কাব্যশিল্পে সয়ম্ভূ। আত্মার সুনির্দিষ্ট যুক্তি নেই; যুক্তিহীন কবিতাগুলো আত্মাপ্রাপ্ত হয়ে মরণশীল মানব সাহিত্য কালোত্তীর্ণ হতে চায় অথবা অমর হতে চায়।
অ.
আত্মা একটি আধ্যাত্মিক দ্রব্য অথবা আত্মা ধারণার মাধ্যমে আত্ম-মানুষের অস্তিত্বদানের পরিকল্পনা। ভারতীয় দর্শনে মন ও আত্মার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করে মন বলতে অন্তরিন্দ্রীয় এবং শুদ্ধ জ্ঞানকেই আত্মা বলা হয়েছে। পাশ্চাত্য দার্শনিকরা মন ও আত্মা সমার্থক বলেই মনে করেন। মূলতঃ আত্মার সুনির্দিষ্ট কোনো অর্থ নেই বলে আত্মাসম্পন্ন একটি কবিতার কোনো অর্থ নেই। কবিতার আত্মা বা আত্মার বোধ যুক্তির সিঁড়ি ভেঙ্গে আসে না, উপলব্ধির তাৎপর্য তীর্যক দ্যেতনার পথে আসে।
কবিতার রুহ প্রতিনির্মাণকৃত ফবপড়হংঃৎঁপঃবফ; আমাদের পূর্বপুরুষরা আত্মার কল্পনা করেছিলেন বলে আমরা কবিতায়, শিল্পে রুহের সন্ধান করি। আত্মা অবিদিকৃত ফবভধসরষরধৎরংবফ। আমরা পূর্বপুরুষ নই, উত্তর পুরুষ; চিন্তার প্রাকরণিক বিকাশ ও মৌল প্রকাশের ভিন্নতা থেকে আত্মা হয়ে উঠে সনাক্তকরণযোগ্য।
নক্ষত্রের নিশ্চিত মৃত্যু সম্পর্কে মানুষ জ্ঞানিক, বৈজ্ঞানিকভাবে জ্ঞাত থাকলেও জীবনানন্দ দাশ জানা বিষয়টি নতুন করে ধারণ করেন অথবা ভাষিক ব্যঞ্জনায় বিষয়ের উপর অস্তিত্ব আরোপ করেন-
নক্ষত্রের একদিন মরে যেতে হয়
হয় না কি বলে সে তাকালো তার সঙ্গিনীর দিকে
রুহের বিভ্রমে কাব্য দুর্বোধ্য হলে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে’র দর্শনমনস্কতা জ্যোতির্ময় হয়। দর্শান্বেষীর চরিত্র লুপ্ত থাকে অপ্তবাক্যে, কবিতার গহীন অস্তিত্বে- যা অস্তিত্বশীল কবিতার অপরিহার্য শর্ত।
হাওয়ায় তোমার অস্তিত্বের ভাষা
ভেসে যায় অহরহ
তবু সাধ যায় তবু করি যাওয়া আসা
নিত্যই আনি নানা ফল কাঁপা ডাঁসা
আনন্দে দুর্বহ
হাওয়ায় তোমার অস্তিত্বে¡র ভাষা
শুনি আমি অহরহ।
(হাওয়ায় তোমার অস্তিত্বের ভাষা/ বিষ্ণু দে)
আত্মা বহন করে যৌনতা, ঈর্ষা, গীতলতা, দর্শন। একটি সার্থক কবিতা মানবাত্মার মুহুর্ত বহন করে আত্মাপ্রাপ্ত হয় এবং প্রাগর্তী আত্মাকে ধারণের মাধ্যমে প্রতিনির্মিত হয় এবং অস্তিত্বলাভ করে যা মানুষ অথবা কবি অথবা কাব্যের প্রতিনির্মাণ।
ওকে যে আমার আজ দেবতার মতো মনে হয়
যে যুবক কাছে বসে তোমার মুখের দিকে চায়।
(ঈর্ষা : সাফো / অনুবাদ: শিশির কুমার দাশ)
এমন পীরিতি কভু নাহি দেখি শুনি
পরাণে পরাণে বান্ধা আপনা-আপনি।।
দুহুঁ কোরে দুহুঁ কান্দে বিচ্ছেদ ভাবিয়া
আধাতিল না দেখিলে যায় যে মরিয়া।।
জল বিনু মীন যেন কবহুঁ না জীয়ে।
মানুষে এমন প্রেম কোথা না শুনিয়ে।।
ভানু কমল বলি সেহো হেন নহে
হিমে কমল মরে ভানু সুখে রহে।।
(মিলন / চন্ডীদাস)
উল্লেখিত দুইটি পৃথক কবিতার চরণগুলির অন্তর্গঠন ও আত্মা পৃথক হলেও উপলব্ধির উৎসারণ যেহেতু যৌনজাত, পৃথক সত্তা নিয়েও পরম্পরার মাপকাঠিতে কবিতা দু’টি সমগোত্রীয়। আত্মার তৃষ্ণা বহুপ্রান্তিক বলে চন্ডীদাস থেকে আলমাহমুদ পর্যন্ত এক একটি কবিতা স্বতন্ত্র সত্ত্বা নিয়ে যোগসূত্রের মাঝে বেঁচে থাকে।
আ.
যৌনভাবে সম্পূর্ণ সুখীজন কর্তৃক কবিতায় রুহ আরোপন প্রায়-অসম্ভব। স্বপ্নাশ্রিত দূর ও নিকট কল্পনার অন্য নাম যৌনতা। জীবের প্রধানতম আকাঙ্খা যৌনতা হওয়ায় সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম, রন্ধ্রন, শিল্প-সাহিত্য যৌনজাত। অবদমিত যৌনতা সৃষ্টিকর্মে সহায়ক বলে সুপ্রাচীন কাল থেকে মনুষ্য সমাজে যৌনতার ক্ষেত্রে বিধি বিধান লক্ষণীয়।
রাধা-কৃষ্ণের লৌকিক প্রেমকথা বা যৌনকথা শ্রী চৈতন্যদেব একটি আধ্যাত্মিক ধর্মদর্শনে রূপ দেন। তাঁর প্রবর্তিত বৈষ্ণবতত্ত্ব অবলম্বনে বৈষ্ণব পদবাবলীতে কৃষ্ণ পরমাত্মা বা স্রষ্টার প্রতীক এবং রাধা জীবাত্মা বা সৃষ্টির প্রতীক। স্রষ্টা, সৃষ্টি পরস্পর প্রেমের সম্পর্কে আবদ্ধ। এক্ষেত্রে সৃষ্টি স্রষ্টার লীলাসঙ্গিনী, আনন্দভোগের সহচরী। স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির প্রণয় সম্পর্কের মধ্যখানে আনুষ্ঠানিক ধর্মের নিয়মনীতি ও আনুশাসনের ঠাঁই নেই। গভীর প্রেমে জীবাত্মা ও পরমাত্মা একাত্ম হয়ে যাবার বাসনায় অধীর। বৈষ্ণব কবি’র ভাষায়-
রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর।
প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর।।
হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কান্দে।
পরাণ-পিরীতি লাগি থির নাহি বন্দে।।
রাধা-কৃষ্ণের গীতিকাব্যিক অভিব্যক্তির মাঝে পৃথক অস্তিত্ব নিয়ে সহাবস্থান করে মহুয়া ও নদের চাঁদ; জীবনানন্দ দাশ এর বনলতা সেন।
যৌনতার জন্য মানুষের ভাষা হয় সাঙ্গীতিক দ্যোতনা ও লালিত্য বিশিষ্ট, কোমল ধ্বণি তরঙ্গিত। রাধা-কৃষ্ণের ব্রজ ও বৃন্দাবনলীলার পদভাষা ব্রজবুলিতে উদ্বুদ্ধ কবি বিদ্যাপতি বাংলা ও মৈথিল মিশ্রিত ব্রজবুলি ভাষায় সাহিত্য রচনা করেন, যা বৈষ্ণব কবিদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। জৈব-মানুষের ‘যৌনতা’ বিষয়টি বিষদ বিশ্লেষণের মানসিক শর্তারোপ করায় অন্যত্র আলোচনার আকাঙ্খা রাখি।
ই.
প্রকৃতি বাস করে মনুষ্যালয়ে। মানুষ ও হিজল বৃক্ষের বসতি অসম্পৃক্ত বলে গাছ, নদী-নালা, পাখি-প্রজাপতি-অন্বেষী কবি প্রতিবেশী জীবের অস্তিত্ব প্রতিস্থাপন করেন শব্দে, নৈর্ব্যক্তিকতায়, কবিতায়।
ইনসেক্ট প্রজাতির মহিলা মাকড়শা দইষধপশ রিফড়দি রতিকর্ম সম্পাদন শেষে পুরুষ মাকড়শাকে জীবন্ত ভক্ষণ করবে জেনেও পুরুষ মাকড়শাটি রতিকর্মের মাধ্যমে আত্মাহুতি না দিলে প্রকৃতি থেকে মাকড়শার এই প্রজাতিটি বিলুপ্ত হত। প্রাণী মাত্রই প্রকৃতির নিয়ম মেনে নিতে বাধ্য। কবি মাত্রই পুরুষ মাকড়শার রতি সুখ ও মৃত্যু-দুঃখ ধারণের মাধ্যমে কুহকের অনুবাদ করেন।
ঈ.
কবিতার আত্মা কোনো দেহাতিরিক্ত সংগঠন নয়, যদিও কবিতার অন্তর্গঠনের সাথে বহির্গঠনের যোগাযোগ মনের সাথে দেহের সম্পর্কের মত। উচ্চ শ্রেণীর আত্মা উচ্চ অঙ্গের শর্তারোপ করায় কাব্য-অঙ্গের ভাঙ্গা-গড়া অতি পুরাতন ও উল্লেখযোগ্য বিষয়। চিন্তার গভীর স্তর ধ্রুপদী ভাষায় বর্ণিত হলেই কবিতার আত্মা স্বাস্থ্যবান হয়, এ ধারণার বিপরীত কবি হলেন রোমান্টিক মেজাজের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাস, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ। একথাও স্মরণযোগ্য যে, চিন্তাকে বহন করে না- কবিতার এমন সারল্য গণসাহিত্যের মর্যাদা লাভ করলেও কবিতার দেহ আজন্ম আত্মাহীন থেকে যায় এবং মহাকালের কাছে তার আর বলবার কিছু থাকে না।
ও.
ধ্যানের সর্বোচ্চ ¯তর যে-ভাষা ও অবকাঠামোতে প্রকাশ পায় তা-ই কবিতা। বেস্ট ওয়ার্ড ইন দ্য বেস্ট অর্ডার- কবিতা বিষয়ে কোলরিজের মšতব্যটি স্মরণে রেখে বলা যায়, মানুষের মৌখিক ভাষা চিরকালই লেখ্য ভাষাকে শাসন করেছে।
একজন কবিকে যেহেতু ভাষাশ্রিত হতে হয় এবং ভাষা যেহেতু একটি সাংগঠনিক রীতি মেনে চলে, এজন্য কবিতার জানা ও আধোজানা বিষয় আলোচনার সাথে সাথে ভাষার রূপ-গন্ধও পরখ করা যেতে পারে। শঙ্কিত হই, ভাষার সীমাবদ্ধতার জন্য কোনও দিন কি মানব মনের অপ্রকাশিত কবিতাগুলো পাঠ করা যাবে না? ভাষা কি একটি সম্পূর্ণ কবিতা প্রকাশের যোগ্যতা রাখে? ভাষিক সীমাবদ্ধতায় প্রকৃত কবিতা মানেই কি অগ্রন্থিত আয়ুর চিৎকার?
মানব উচ্চারিত প্রতিটি ধ্বনিই হচ্ছে শব্দ আর প্রতিটি শব্দের সাংগঠনিক রূপই হচ্ছে ভাষা। ভাষার বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যে আতিথ্যধর্মই ভাষাকে মহৎ ও বিস্তৃত করে। এর মানে কি গৌণ হয়ে যাওয়া সংগঠন ভাষার জন্য অত্যাবশীয় নয়? সাংগঠনিক উদারতা ও ব্যাপ্তির মাঝে সংগঠন বেঁচে থাকে, অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট সমস্যা যেহেতু ভাষারই সমস্যা, এজন্য ভাষা বিষয়ে সৃজন দাবী করে নতুন চিন্তা।
শব্দ আসে অদৃশ্য থেকে দৃশ্যতম মানুষের মাঝে। মানুষের শব্দ ধারণের ক্ষমতা সসীম জেনেও অন্বেষী কবি অসীমে আত্মপ্রতারিত হন, আত্মপ্রতারিত কবি’র শিল্পের সাথে প্রতারণার কিছু থাকে না। নৈঃশব্দ্যে,শব্দাহত কবির কাছে ধরা দেয় আকাশ ও আরশের ঘ্রাণ। শব্দ যেখানে সীমা নির্ধারণ করে, নৈঃশব্দ্য থেকেই কি শব্দ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন অন্ধ কবি হোমার!
প্রকৃতির নিয়মে কবিকেও সীমাবদ্ধ থাকতে হয়। পদ্য কবিতা, গদ্য কবিতা, আধুনিক, উত্তরাধুনিক ও সকল নিম্নমার্গীয় তর্ক প্রতর্কের মাঝে রুহ সম্পন্ন কবিতায়ও থাকে বিদ্বেষের বিষ, প্রতিশোধের ফণা; যেহেতু কবিতার রুহ কবিসৃষ্ট, যিনি মনুষ্য সমাজেরই বাসিন্দা।
ছিল সেটা গৃহযুদ্ধ
আমার ভিতরে
... ... ...
ভোরের দিকে গৃহযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরিত হয়ে যায়।
(আব্দুল মান্নান সৈয়দ)
ভাত দে হারামজাদা
তা না হলে মানচিত্র খাব
(রফিক আজাদ)
মানুষ শব্দের কাছে আত্মসমর্পিত হলেই শব্দাশ্রিত মানবাত্মা মিশে যায় ভাষিক ব্যঞ্জনায়, কবিতায়। সসীম মানুষ পূর্ব নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করতে পারে না ঠিক, ধারণের মাধ্যমে অসীমে ছড়িয়ে দিতে পারে আত্মিক হাহাশ্বাস যা রুহের অনুবাদ।
নিতল শূন্যতায় যেতে যেতে আমি পাই যেন অস্তিত্বের নূর
পরলোক অন্ধকার ভাল লাগে- সেইখানে থাকে যেন চিরন্তন ভোর।
(চিরন্তন/ কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার)
নিজের অ¯িতত্ব প্রকাশের জন্য মানুষ তার ভাষাকে প্রকাশ করে কী-না এ নিয়ে হাইডেগার বলেন- একজন মানুষ ভাষার সাহায্যে নিজকে প্রকাশ করে না বরং সত্তার উপাদান হয়ে ভাষা নিজেই মানুষের মাধ্যমে প্রকাশ করে। তিনি বলেছেন- ল্যাঙ্গুয়েজ ইজ দ্য হাউস অব বিইং। জাক দারিদা মনে করতেন, অধিবিদ্যার কারণে মানুষের ভাষা-কেন্দ্রিক জ্ঞান কখনোই মত্যের সন্ধান পায়নি। এডওয়ার্ড সপির মতে- ‘ভাষা কোনও ভাবে মানুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। একজন মানুষের মাতৃভাষা ও ভাষা প্রয়োগের নিয়মাবলীই নির্ধারণ করে একটি মানুষের চিšতা, চেতনা ও দৈনন্দিন ক্রিয়াকর্ম।’ বিষয়গুলো বিষদ বিশ্লেষণের দাবী রাখে। প্রশ্ন তৈরি হতে পারে- কবিতা কি মানব রচিত ভাষা সংগঠনের কোনও সাধারণ সদস্যের নাম? প্রাচীন মানুষের ধ্যানের ফসল হচেছ ভাষা। কবিতার মৃত্যু হলে ভাষার মৃত্যুও অনিবার্য কিনা সে প্রশ্নটি পাশ কাটিয়ে বলা যায়- ধ্যানহীন কবিতা যে-ভাষাই বা যে- কৌশলেই রচিত হোক না কেন, মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।
Add a Comment