লিটমুড
Published : 24 Jan 2026, 06:40 AM
ঊনিশ শ সাতাত্তর সালের শেষ ভাগ । বয়স সাড়ে ছয়। এই সময়ে এসে টাঙ্গাইলের গ্রাম-শহরের আলো-হাওয়ায় বড় হওয়া জীবনের বাঁক বদল হলো। চারমাসের জন্য চলে যেতে হলো কোটবাড়ি, কুমিল্লা। কুমিল্লার কোটবাড়ি- লাইনটা এভাবেও লিখতে পারতাম। কিন্তু কোটবাড়ি, কুমিল্লা কেন লিখলাম! কারণ, নানার কাছে চিঠি লেখার সময় পোস্ট কার্ডে লিখতাম, হইতে, কোটবাড়ি, কুমিল্লা। যাই হোক চার মাস মায়ের সরকারি চাকরির সুবাদে কোটবাড়ি থাকতে হয়েছে । এরপর আবার একবছর পর চারমাস ছিলাম। কিন্তু প্রথমবারের মতো রোমাঞ্চ আর পাইনি। প্রথমবার পাহাড়, গাছপালা, পাহাড়ি পুকুর ছিলো অদ্ভুত ভালোলাগা। সফেদা গাছ প্রথম দেখলাম। কোয়ার্টারের পেছনের লাল পুকুরটাতে ধোপার কাপড় কাচার নান্দনিক আওয়াজ! প্রজাপতির পেছন পেছন ছোটা, গোলাপের কুঁড়ি রাতের বেলা গ্লাসের জলের মধ্যে রেখে দিয়ে সকালে তা ফুটন্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে বিস্মিত হওয়া, পাতাবাহারের ডাল কাচের বোতলে রেখে শেকড়ের জন্য অপেক্ষা করা। আহা! কী আনন্দ!
আর দেয়াল টপকালেই ময়নামতির শালবন বিহার। দেয়ালের দার ঘেষে রাস্তা থেকে সাদা সাদা পাথর সংগ্রহ।
নাহার খালাম্মার নাচের ক্লাসে একটাই নাচ তুলতে হবে, গেরস্ত বউ জল আনতে যায় সে নদীর বাঁকে, আর নাসরীন খালাম্মার গান ‘এখন বাতাস উঠুক তুফান ছুটুক ফিরব নাকো আর, আমাদের যাত্রা হলো শুরু।’ গান এবং নাচের ক্লাস আমাদের জন্য অর্থাৎ শিশুদের জন্য বাধ্যতামূলক। আমার অবশ্য নাসরীন খালাম্মার গলায় ভালো লাগত ‘ফুল ফাগুনের এলো মরসুম, বনে বনে লাগল দোল’। অসম্ভব সুন্দর জীবন আমাদের মায়েদের! বাবারা কেউ সঙ্গে নেই। মায়েদের সঙ্গে কেবল তাদের সন্তানরা। কেবল ঈদের সময়ই বাবাদের উপস্থিতি। প্রতিদিন মায়েরা সকাল নটায় ক্লাশে যান। দুপুরে ফেরেন। বিকেলে নানা সাংস্কৃতিক একটিভিটিজ। রান্না নেই, বাজার নেই, কেরোসিন কেনার তাগিদ নেই। ক্যাফেটেরিয়ার সুস্বাদু খাবার। মায়েরা যখন ক্লাসে আমরা তখন কোটবাড়ির সফেদা বাগানে ঘুরে বেড়াই। লালমাই পাহাড়ের চূড়ায় উঠে ছোটো ছোটো পেয়ারা গাছে পাকা পেয়ারা দেখে বিস্মিত হই। আমি সংগ্রহ করি পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা রঙিন ঘাস।
শীত আসছে আসছে করছে। এমন সময় আবার বাঁক বদল। এমন বদল যে কস্মিন কালেও কেউ ভাবতে পারেনি। যেন বন-জঙ্গল পেরিয়ে এক অচেনা উষর ভূমিতে আবাস গাড়লাম। রাতের অন্ধকারে যেখানে পৌঁছলাম ওটা একটা গ্রাম। ধানুয়া। শিবপুর থানায়। উঠোনঅলা টিনের দোচালা ঘর। দূরে রান্না ঘর। অনেক শিম, লাউ , ডাঁটা চাষ করেছিলাম আমরা। রাতে প্রতিবেশিদের বাড়িতে খেয়ে গভীর ঘুমে কাদা হয়ে গেলাম। ঘুম ভেঙে দেখলাম। এত্তো আলো! আঙিনার বেড়ার ওপর দিয়ে দেখা যায় আসাদ কলেজ। ঝাঁকড়া শিমুলের গাছ লাল ফুলে রঙিন। জায়গাটিকে ভালোবেসে ফেললাম তক্ষুণি। চারদিকে বিস্তীর্ণ খোলা ধানী জমি। সবজি ক্ষেত। নাক সিঁটকালো আমার মা। এ কেমন জায়গা রে বাবা! সবাই লম্বা আচকান টাইপের পাঞ্জাবি পরে! মাথায় টুপি। ছেলেরা লুঙ্গি পরে কলেজে যায়! সাদত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া মা আমার ভাবতেই পারেন না, লুঙ্গি পরে কেউ কলেজে আসতে পারে! এখানে আমার তেমন কিছু করার নেই। গান নেই, নাচ নেই, ইস্কুল নেই। খালি বই পড়ি। বই ছাড়া আমার কোনো সঙ্গী নেই।
তো, আমি ছিলাম ইঁচরে পাকা টাইপের এক গ্রন্থকীট। যা পেতাম তাই পড়তাম। হাতের কাছে যা থাকত। তা ে বড়দের বই, নাকি ছোটেদের বই- এ নিয়ে মাথা ব্যথা ছিলো না । গল্প, না উপন্যাস, না কবিতা! কী না পড়তাম! কোনোটাই বাদ যেত না। ছয় বছর বয়সে করতলগত করে ফেলেছি রবি ঠাকুরের সঞ্চয়িতা। শিশু ও শিশু ভোলানাথ প্রায় মুখস্ত। প্রিয় কবিতার লাইন, কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, আমরা দুজন একটি গাঁয়ে থাকি। প্রিয় গান , এদিন আজি কোন ঘরে গো খুলে দিলো দ্বার। আর আলেকজান্ডার পুশকিনের গল্প, সোভিয়েত ইউনিয়নের বই; তিয়াপা বরকা রকেট। কীভাবে যে এগুলো মা-বাবা দুজনেই মাথার ভেতর গেঁথে দিতে পেরেছিলেন জানি না। ছয় বছর বয়সের সেই সঞ্চয়িতা আজো আমার শিথানের পাশেই থাকে। তো যা বলছিলাম , আমি এক ইঁচরে পাকা টাইপের গ্রন্থকীট ছিলাম। নানুর কাছ থেকে দত্তা, গৃহদাহ নিয়ে শেষ করে ফেলেছি ক্লাস থ্রিতে। ফোরে ‘পথের দাবি’। আর পত্রিকার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়া। গোগ্রাসে সব গিলতে থাকা। এমনকি বিজ্ঞাপনও। নিজের বই, অফিসার্স লাইব্রেরির বই, সব পড়া শেষ। বই না থাকলে ঠোঙ্গা। কী এক নেশা যে আমার! মা তখন কী যেন একটু একটু লেখেন। আমাকে পোস্ট করতে পাঠান চিঠি। কদিন পরে ডাকে আসে ‘তিতাস’ আর ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া’ নামে দুটি পত্রিকা। আমার মা নিয়মিত লিখতেন তাতে। আমার লেখাও পাঠাতেন। সেই সময় বাসায় রাখা হতো, ইত্তেফাক, পূর্বাণী, চিত্রালী। আমাদের ঈদ মানে কাপড়-চোপরের সঙ্গে ঈদসংখ্যা।
আমি এখনো মনে করতে পারি দুই নৌকার মাঝখানে পড়ে থাকা একটি লোকের ছবি। তার পাশে একটি কুকুর। পবনার কুকুর। যার মনিব সারারাত ধরে বাজি রেখে আমিত্তি খেয়েছে। ‘আমিত্তি’ নামের এই মিষ্টির সঙ্গে আমার পরিচয় শিবপুরেই। টাঙ্গাইলে আমিত্তি হয় না, হয় রসগোল্লা , চমচম। শিবপুরের এই মিষ্টিটাকে তেমন ভালোবাসতে পারিনি। যেমন ভালোবাসতে পারিনি চম্পাকলা। খালি মনে হতো টাঙ্গাইলের বৈশাখি মেলা, পূজার কথা। এখানে পূজা দেখা অপরাধ। মেলায় যাওয়া, নদীর ধারে বেড়াতে যাওয়া সবাই কেমন চোখে দেখত, হাসাহাসি করত। তবু, অফিসারের মেয়ে বলে আমি পার পেতাম। নদীর পাড়ে যে বেড়াতে যাওয়া যায় এ কনসেপ্টই সেখানে ছিল না। আমি কলেজ ফাংশনে নেচেছিলাম বলে মক্তবের বড় হুজুর জালি বেত দিয়ে মেরে অজ্ঞান করে ফেলেছিল। এ নিয়ে দেন দরবারও হয়েছে। বিদেশি আমরা, মেহমান। আমাদের গায়ে স্থানীয়রা হাত দিতে পারবে না। যাই হোক, আমি বেশিরভাগ সময়ই পড়ি। সেই সময় আমি গ্রেটা গার্বো, ব্রিজিত বার্দোত, লিজ টেলরের কাহিনী পড়ে ফেলেছি। এমনকি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ধারাবাহিক ‘চিলেকোঠার সেপাই’ পড়েছি। দুঃখিত পাঠক আমি কেবল নিজের ঢোল বাজিয়ে যাচ্ছি। আমি আসলে ইমদাদুল হক মিলনের ‘গাহে অচিন পাখি’র কথা বলবো। গল্পটি যখন পড়লাম, তখন এর ভাষা, পরিবেশ, আমার চেনা মনে হলো। মনে হতো, শিবপুরের এই বাজারে পবনা তার নেড়িকুত্তাটা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আমিত্তির দোকনটাও আমার চেনা, নদীর ধারটাও। আর দুটো নৌকাও। আর জ্বীন-পরীর কথাও আমি শিবপুরেই প্রথম অবগত হই। সব মিলিয়ে পবনাকে আমি চিনি।
পবনা সারাদিন বাজারে , এখানে সেখানে ঘুড়ে বেড়ায়। রাতে মাছচালায় শোয়, আর দোকানে দোকানে ঘুরে যা পায় তাই খায়, নয়তো না খেয়ে থাকে। যে রাতে পবনার আমিত্তি খেতে ইচ্ছে করেছিল, সে রাতটা অন্যরকম ছিলো। লতিফ অনেক টাকার মিষ্টির অর্ডার পেয়েছে। সারারাত জেগে মিষ্টি ভাজতে হবে। লতিফের দোকানের আমিত্তির ঘ্রাণ বাজার ছাড়িয়ে এ তল্লাটের আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। সে ঘানে আপ্লুত হয়ে পবনা লতিফের দোকানের সামনে ঘুর ঘুর করে। পবনাকে দেখে লতিফের একটু ভালো লাগে। কারণ সে শুনেছে আমিত্তির গন্ধে নাকি জ্বীন পরীরা ছুটে আসে। তার একটু একুট ভয় লাগতে থাকে। পবনাও বলে, কত্তা কী যে ঘ্রাণ! এটা ওটা বলে একসময় পবনা আমিত্তি চেয়েই বসে। কিন্তু লতিফ তাকে একটা আমিত্তিও দেবে না,
কারণ সে পাই-পাই হিসাব করে, নিজের খেতে ইচ্ছে হলেও খায় না, সংসারে তার অভাব, সাতখানা পোলাপান আরো একটা পেটে বউয়ের, বুড়ি মা ছাড়াও একটা ঢ্যাংগা বোন। ‘পবন ঠাকুর নাছোরবান্দা আমিত্তি খাবে, সারাদিনের ক্ষিধে তার চেগে উঠেছে, মাজেদ খাঁ আধমণ আমিত্তির অর্ডার দিয়েছে বাপের চল্লিশার জন্য, গরু কেটে বিরাট খানা দেবে, সেই অর্ডারের আমিত্তি ভাজা হচ্ছে, এ সময় পবনের আগমন এবং প্যাঁচাল, পাগলা পবন বলে এক বসায় আড়াইসের আমিত্তি খেতে পারবে, তার বাপে পাঁচ সের খাইতে পারতো, শুনে মুদি-মনোহারির দোকানদার আউয়াল বেশ আমোদ পায়, বলে কি রে পাগলা! সে তখন বাজি ধরে, পবন ঠাকুর খেতে শুরু করে আর পুরনো কালের গল্প জুড়ে দেয়,’ বাপ তার ছিলো ভয়ঙ্কর ডাকাত। চরে ডাকাতি করতে গিয়ে সাগরেদদের সঙ্গে কাজিয়া লাগে, তারপর সবাই মিলে কল্লা কেটে মিষ্টি পাঠানোর মতো করে তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয় একদিন। তার মা একজনের সঙ্গে পালিয়ে যায়। পবন আমিত্তি খায় আর গল্প বলে। তারপর দাইমার বাড়ি স্থান হলো, তার মেয়ে হরিদাসীর সঙ্গে বিয়ে দিলো দাইমা, হরিদাসী পোয়াতি হলো, কিন্তু বাচ্চা হওয়ার আগে হরিদাসী মরে গেল। তার গল্প শুনতে-শুনতে রাত্রি আরো গভীর হলো, আমিত্তি শেষ করলো এক সময়। কিন্তু শেষ আমিত্তিটা খাওয়ার সময় তার শরীরটা কেমন করে উঠে। কোথায় একটা পাখি কূ দেয় মনের মধ্যে। সে ধীরে ধীরে গাঙের পাড়ে যায়। আর দুই নৌকার মাঝখানে শুয়ে পাড়ে। তার নেড়ি কুত্তাটা সেই দৃশ্য দেখে । তারপর এক ঠ্যাং তুলে পেচ্ছাপ করে। আর একটা ঘেউ দেয়।
এমন অদ্ভুত একটা গল্প কেউ লিখতে পারে ভেবে আমার খুব অবাক লাগে! আমি আর আমার মা দীর্ঘদিন সেই গল্পটা নিয়ে কথা বলতমা। পবনের কুত্তাটা একটা ঘেউ দেয়। এরপর পড়লাম ইমদাদুল হক মিলনের উপন্যাস ‘ভূমিপূত্র’। ‘ভূমিকা’। বড় হয়ে আর পড়া হয় নি। ‘ভূমিক’াতেই সম্ভবত এরকম একটা লাইন আছে - মা, বিন বিন করে কাঁদছে। সে বুঝে যায় আজ তাদের এই এই বাড়ি ছাড়ার সময় হয়েছে। তার আর একটা নতুন বাবা হবে।
এরপর ১৯৮০ সালে আমরা ঢাকায় চলে আসি। পড়াশোনার চাপে তখন দীর্ঘদিন মিলনের লেখা পড়া হয়নি। নাইনে তুলির কাছে দেখলাম ‘ও রাধা ও কৃষ্ণ’, নায়ক হিসেবে পেলাম অলিকে। তার কোন এক বইয়ের উৎসর্গে একটি কবিতা ছিল:
তুমি আমার চোখ দেখো
তুমি আমার মুখ দেখো
আর চোখ বুুঁজে দেখো আমার হৃদয়
ভালোবেসে সেখানে কেবল তোমারই নাম লিখেছি।(সম্পূর্ণ স্মৃতি থেকে )
এসময় আফজাল হোসেন , ইমদাদুল হক মিলন প্রিয়জন পত্রিকা বের করতেন। এসময়ই তিনি প্রচ- জনপ্রিয় লেখক হয়ে যান। আর সাহিত্য অঙ্গনে জনপ্রিয়, শস্তা লেখক বলে তাঁর নাম ভাসতে থাকে। আমি মিলনকে ভালো লেখক বলাতে অনেকেই আমাকে তাচ্ছিল্য করেছেন। কিন্তু আমি এখনও বিশ্বাস করি যারা বড় বড় কথা বলেন, ওইরকম গল্প লেখার ক্ষমতা তাদের নেই। ওই ‘ভূমিকা’ এবং ‘ভূমিপুত্রে’র মতো উপন্যাস লেখার সাধ্য নেই অনেকেরই। আর আমার কাছে সবময়ের জন্য ইমদাদুল হক মিলনের শ্রেষ্ঠ গল্প ’ গাহে অচিন পাখি’।
লাবণ্য প্রভা
কারওয়ান বাজার
১১/০৯/১৯
Add a Comment