লিটমুড
Published : 24 Jan 2026, 06:56 AM
পৃথিবীতে নারী নিয়ে যতো আলোচনা হয়েছে ততো আর কোনো বিষয় নিয়ে হয়েছে কিনা সন্দেহ আছে। আর নারী বিষয়ক আলোচনার কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে নারীবাদ। সুলেখক আহসান হাবিব লিখেছেন নারীবাদ নিয়ে বংশাইটাইমসে । ৪ পর্বের ধারাবাহিক এই লেখা পড়তে সঙ্গে থাকুন
৬
পিতৃতন্ত্র এখনো আমাদের অনগ্রসর সমাজে গেঁড়ে বসে আছে। এখানে পিতাই প্রভু। তার আদেশ শিরোধার্য। যদি তা ভুল হয়, তবুও। পিতা হচ্ছে বাড়ির প্রভু। তার আদেশেই বাড়ির প্রতিটি পাতা নড়ে। ঈশ্বর যেমন এই মহাবিশ্বের তথাকথিত প্রভু, পিতা তেমনি বাড়ির প্রভু। বাড়ি মানে পরিবার।
পিতা প্রভুত্ব করে পরিবারের সবার উপর, এমনকি তার বৃদ্ধ পিতামাতার উপর। যখন পিতা বৃদ্ধ হয়ে পড়ে, অর্থনৈতিক কাজে জড়িত থাকে না, তখন তিনি পিতৃত্ব হারিয়ে ফেলেন। অর্থাৎ পিতা মানেই অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষমতাবান একজন মানুষ, একজন পুরুষ। দেখা গেছে কোন পরিবারে যদি পিতার জায়গায় কোন নারী অর্থনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে বসেন, তিনি পিতা হয়ে ওঠেন। তিনি ঠিক পিতার মতই আচরণ করেন।
পিতা কি করেন?
তিনি পরিবারের সব কর্তৃত্ব নিজের হাতে রাখেন এবং তিনি যা চান, তাই হয়। তিনি চান তার নির্দেশ ছাড়া যেন কেউ নিজে থেকে কোন কাজ না করেন। তিনি দুই ধরণের নির্দেশ জারি করেন- ছেলেদের জন্য একরকম, মেয়েদের জন্য আর এক রকম। ছেলেদের জন্য থাকে অবারিত স্বাধীনতা, মেয়েদের জন্য থাকে এক গুচ্ছ বিধিনিষেধ। ছেলেদের পোষাক এবং মেয়েদের পোষাক আলাদা করে দেয়া হয়, মেয়ে যত বড় হতে থাকে, বিধিনিষেধ বাড়তে থাকে। একসময় ছেলেটি ঘুরে বেড়ায় থ্রি কোয়ার্টার, হাফ গেঞ্জি গায়ে লোমশ বুক দেখিয়ে, মেয়েটি ততদিনে কালো বোরখায় ঢেকে ফেলেছে কিংবা এমন পোষাক যা তার শরীরকে এমনভাবে ঢেকে রাখবে যাতে অন্য কেউ তা দেখতে না পায়। মেয়েকে ঘরের বাইরে যেতে মানা করা হয়, ছেলে সেক্ষেত্রে মুক্ত। মেয়ে থাকবে ঘরে, ছেলে থাকবে বাইরে। ছেলে হবে ডানপিটে, মেয়ে হবে শান্তশিষ্ট। ছেলেরা খেলাধুলা করবে, মেয়েরা রান্না শিখবে। মেয়েরা লেখাপড়া শিখলেও তাদের গড়ে তোলা হবে ছেলেদের উপযুক্ত কনে হিসেবে। খুব বেশি লেখাপড়ার দরকার নাই।
পিতা মেয়েদের জন্মগতভাবেই আলাদা বলে আদেশ জারি করবে। মেয়েদের খেলাধুলা করতে নেই, বেশি লাফঝাঁপ দিতে নেই, বেশি খেতে নেই, ব্যায়াম করতে নেই,
মেয়েদের ভারি কাজ করতে নেই। তাদের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাবে এমন কিছু করতে নাই। তারা রান্নাবাড়া এবং বড়জোর সেলাইয়ের কাজ করবে। তারা স্বামী সেবা করবে, ভাইদের দেখাশোনা করবে। তারা নিজেরা কিছু হতে চাইতে পারবে না, পিতা যা চাইবেন তাই তাদের হতে হবে।
পিতা একগুচ্ছ মিথ তৈরি করেন। এর প্রায় সবকিছুই শরীর সম্পর্কিত। পিতা ধর্মের একজন প্রতিভূ হয়ে ওঠেন, ধর্ম যা বলে তাই তিনি চাপিয়ে দেন মেয়েদের উপর, কদাচ ছেলেদের উপর নয়। মেয়েদের শেখানো হয় তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে পুরুষদের মনোরঞ্জনের জন্য, সন্তান জন্ম দেয়া ও লালন পালনের জন্য। পিতা মেয়েদের পায়ে পরিয়ে দেন নিষেধের বেড়ি, ছেলেদের করে দেন মুক্ত পাখি। পাখি, কিন্তু পিতার বানানো কাঠামোয়।
এই হচ্ছে আমাদের পরিবারের চিত্র। এই পরিবেশেই বেড়ে উঠে মেয়ে এবং ছেলেরা। বৈষম্য এবং ভুল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বড় হতে থাকে। মেয়েদের পায়ে থাকে শত প্রতিবন্ধকতার শৃঙ্খল। সেই শৃঙ্খল ক্রমে ভাংতে শুরু করেছে, কিন্তু আমাদের মত পিছিয়ে পড়া সমাজের চিত্র খুব বেশি বদলায়নি।
নারীবাদের কাজ পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে প্রতিবাদ। পরিবার ঠিক, সব ঠিক। পিতৃতান্ত্রিকতার সমস্ত ট্যাবু ভেঙে ফেলাই হবে নারীবাদের অন্যতম কাজ।
৭
পুরুষতন্ত্র সমাজ বিকাশের গোড়া থেকেই দুটি ভিন্ন ভিন্ন ভাবমূর্তি নির্মাণ করতে করতে এগিয়ে গেছে। একটি পুরুষের জন্য, অন্যটি নারীর জন্য। পৃথিবীর সমস্ত প্রধান প্রধান পুরাণ এবং ধর্মগ্রন্থে এসব বিধৃত আছে। গ্রীক পুরাণে আটলান্টা নামের এক মেয়ের কাহিনী আছে। দেবতার বরাত দিয়ে সেখানে বলা হয়েছে যে জন্মের পর বিয়ে হবে তার জীবনের কাল। তাই বিয়েকে এড়ানোর জন্য তাকে পাঠানো হল নির্জন এলাকায়। সেখানে সে বিভিন্ন খেলাধুলায় পারদর্শী হয়ে উঠলো, তার শরীর হয়ে উঠলো পুরুষের মতই পেশিবহুল। দৌড় প্রতিযোগিতায় তাকে কেউ হারাতে পারে না। সে যুবতী হয়, বিয়ে এড়ানোর জন্য সে শর্ত দেয় যে তাকে হারাতে পারবে, তাকেই সে বিয়ে করবে। সে হারত না যদি না দেবতারা চক্রান্ত করতো। বিয়ে করতে বাধ্য হয় এবং জীবনে নেমে আসে কাল।
এখানে কয়েকটি সত্য বেরিয়ে আসে- মেয়েরা ছেলেদের মতই খেলাধুলায় পারদর্শী হতে সক্ষম, দেবতারা পুরুষ এবং বিয়ে নারীর জীবনে কাল হয়ে দেখা দেয়। এর মধ্য দিয়ে পুরুষ যে ভাবমূর্তি নির্মাণ করে তা হল পুরুষ অজেয়, নারীকে বিয়ে করে পুরুষ মানে স্বামীর অধীনে থাকতে হবে এবং থাকতে হবে অন্তঃপুরে। অন্তঃপুর মানেই দাসত্ব গ্রহণ।
বিয়ের পর একজন নারীকে কি করতে হয়?
সংসারের যাবতীয় কাজ তাকে সাম্লাতে হয়, সন্তান জন্ম দিতে হয়, তাকে লালনপালন করতে হয়। সব করে নারী, কিন্তু নারী সন্তানের মালিক হয় না, হয় পুরুষ। পুরুষ নারীকে যে কোন সময় ঠুনকো অজুহাতে বিদায় করতে পারে, নারী সবকিছু হারিয়ে একলা হয়ে পড়ে। পুরুষ নারীর এই ভাবমূর্তি তৈরি করে যে নারী শুধু জন্ম দেবে, মালিক সে হতে পারবে না।
ইসলাম ধর্মে আছে একজন পুরুষ একসংগে চারজন নারী বিয়ে করতে পারবে, কিন্তু নারী একজনের বেশি নয়। অর্থাৎ পুরুষ যা পারবে তা পারবে না। হিন্দুদের মহাভারতে আছে পাঁচজন পুরুষ একজনকে বিয়ে করছে, হ্যা আমি পঞ্চপাণ্ডব এবং দ্রৌপদীর কথাই বলছি। এখানে নারীর ভাবমূর্তি একই- সে কেবল পুরুষের ভোগ্যবস্তু।
জালালুদ্দিন রুমি যে এত কালজয়ী কবি, শত শত বছর তার ধরে কবিতা মানুষ আওড়ায়, তিনিও বলছেন সুরার সংগে যদি প্রেয়সী থাকে তাহলে তা সর্গ না হয়ে পারে না, অর্থাৎ সুরার মতই নারী হচ্ছে ভোগ্যবস্তু। শুধু রুমি নয়, পৃথিবীর কোন কবিই নারীর ঐ ভাবমূর্তি অতিক্রম করতে পারে নাই। হেলেন যদি অমন সুন্দরী না হতেন, তাহলে হয়তো ট্রয়ের যুদ্ধই হতো না, নির্মিত হতো না হেলেন অব ট্রয়।
পুরুষের বানানো ভাবমূর্তির অন্যতম হলো নারী কেবলি ভোগ্যবস্তু।
Add a Comment