ফিচার
Published : 27 Jan 2026, 06:00 AM
একটি ছবি, একটি দৃশ্য, একটি ঘটনা ঘুরে বেড়াচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে , সংবাদপত্রে। । দৃশ্যটি মানুষকে কাঁদিয়েছে। দৃশ্যটি মানুষকে ভাবিয়েছে।
জেলগেটে মানুষ যখন যায়, তখন সে তার প্রিয়জনের জন্য নিয়ে যায় একটু স্বস্তির বারতা। কিন্তু স ম্প্রতি ঘটে গেলো অন্যরকম এক ঘটনা। যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটক সাক্ষী হলো এক বিরল ও হৃদয়বিদারক দৃশ্যের। সেখানে ৯ মাসের শিশু সেজাদ হাসান তার বাবার দেখা পেতে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু সে আর কথা বলেনি। নিথর দেহে, সাদা কাফনে মোড়ানো অবস্থায় সে এসেছিল তার জীবিত বাবার কাছ থেকে শেষ বিদায় নিতে।
শিশু সেজাদ বাবাকে দেখেনি। বাবার কোলে চড়েনি। পৃথিবী এই বয়সেই তাকে চিনিয়ে দিয়েছে মানুষের নির্মমতা। তাই মরে গিয়ে বাবাকে দেখতে নিজেই চলে গেছে কারাফটকে মৃত মায়ের সং্গে।
কারাবন্দী বাবা জুয়েল হাসান সাদ্দাম হয়তো জানতেনও না, তার স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা আর আদরের সন্তান সেজাদ আর এই পৃথিবীতে নেই। রাজনীতির প্রতিহিংসা আর আইনি বেড়াজালের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে একটি সাজানো সংসার কীভাবে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, এই ঘটনা তারই জীবন্ত উদাহরণ।
এখানেই মানবতা প্রশ্ন তুলেছে। রাষ্ট্র ও প্রশাসন কি এতটাই যান্ত্রিক যে, একজন পিতাকে তার সন্তান ও স্ত্রীর জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য সামান্য প্যারোল দেওয়া যায় না? জেলগেটে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য অ্যাম্বুলেন্সের কাঁচের আড়াল থেকে মৃত মুখগুলো দেখার সুযোগ দেওয়া কি যথেষ্ট ছিল?
বিদ্যমান 'প্যারোল মুক্তি-সংক্রান্ত নীতিমালা-২০১৬' অনুযায়ী নিকটাত্মীয়ের মৃত্যুতে প্যারোলের সুযোগ থাকলেও, কোনো এক অদৃশ্য কারণে সাদ্দাম সে সুযোগ পায়নি।
রাজনীতির মঞ্চে সাদ্দাম হয়তো ভিন্ন মতাদর্শী। কিন্তু কারাফটকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষটি ছিলেন কেবলই একজন নিঃস্ব পিতা এবং স্বামী। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা এতটাই কি ভঙ্গুর যে, একটি ৯ মাসের শিশুর লাশের ভার নিতে ভয় পায়? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথিপত্রে হয়তো এটি একটি সাধারণ 'প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত', কিন্তু ইতিহাসের কাছে এটি এক কালো অধ্যায়।
শিশু সেজাদের এ ঘটনা রেখে গেছে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন। একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে হলে আগে মানুষের শোককে সম্মান করতে শিখতে হয়। রাজনীতির রঙ যা-ই হোক, একজন মানুষের শেষ বিদায়ের অধিকার কেড়ে নেওয়া কোনো সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। আমরা যেন ভুলে না যাই, লোহার শিকল হয়তো শরীরকে বন্দী করতে পারে, কিন্তু স্বজন হারানো পিতার আর্তনাদ আর মৃত শিশুর এই নীরবতা ইতিহাসের পাতায় এক গভীর কলঙ্ক হয়ে রয়ে যায়।
শিশু আয়নালের সমুদ্র উপকূলে পড়ে থাকার যে দৃশ্য বিশ্ববাসীকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, সারা পৃথিবী যেমন কওে কেঁদেছিল, শিশু সেজাদের জন্যও সেভাবে কেঁদেছে সারাদেশের মানুষ।
এ ঘটনায় আসলেই কি টনক নড়বে মানবতার রক্ষকদের?
; মতামত লেখকের নিজস্ব
Add a Comment