ফিচার
Published : 26 Jan 2026, 11:36 AM
আমাদের বাড়ির সামনে একটি খাল। খালে সারাবছরই কিছু না কিছু পানি থাকে। তো সেই জলাভূমিতে ছিলো বেশ শক্তপোক্ত একটা ধঞ্চে ক্ষেত। ধান না, পাট না, ওই ধঞ্চে ক্ষেত কেন যে গ্রামের লোকজন রেখেছিল বুঝতাম না। পড়ে বুঝেছিলাম। খালপাড়ে গ্রামের নারীরা ধান ধুতে যেতও। পাটের আঁশ ধোয়া হতো। ধঞ্চে গাছগুলো ছিল একটু আড়াল ।
সেই আড়াল সরিয়ে আমরা যারা শৈশব বা কৈশোর অতিক্রম করছিলাম তারা অনেক সময় অনেক রহস্য উদঘাটন করে ফেলতাম। তবে কারো কাছে বলতাম না। ওই ধঞ্চে ক্ষেতেই লুকিয়ে রাখতাম সবকিছু।
আমার ওই ধঞ্চে ক্ষেতের কথা মনে পড়ছে খুব। কয়েকদিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি রিল এলো আমার টাইম লাইনে। ‘ সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ল সিরিয়াল কিলারের দুর্র্ধষ কর্মকান্ড’। প্রথমে আমি ফেইক ভেবে বিষয়টিতে মনোযোগ দেইনি।
পরের দিন নিউজ।
পরের দিন টক অব দ্য টাউট।
পর পর কয়েকদিন ধরেই চলেছে।
এরকম অবস্থায় আমার শৈশবের ধঞ্চে ক্ষেতের কথা মনে পড়ল। তাই লেগে পড়লাম। সংবাদ মাধ্যমে চলে আসা সব তথ্য একাট্টা করে ভাবতে থাকলাম। বলতে পারেন, পৃথিবীতে ভাববার অনেক কিছুই আছে, সব ফেলে আপনি এই বিষয়ে পড়লেন কেন? জানি না। আমার কেবলই ধঞ্চে ক্ষেতের কথা মনে পড়ছে।
যাই হোক। সংবাদে চোখ ফেরাই। সাভারের পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টারে গত সাত মাসে ঘটে যাওয়া একের পর এক হত্যাকাণ্ড এবং মরদেহ পুড়িয়ে ফেলার ঘটনাটি জানার পর মানুষ অবাক হয়ে ভাবছে। সাধারণ ভবঘুরের আড়ালে এমন ভয়ঙ্কর অপরাধী লুকিয়ে থাকতে পারে! ঘটনাটি সুস্থবুদ্ধির মানুষের কাছে একটি বড় ধরনের ‘যৌক্তিক ধাঁধায়’ পরিণত হয়েছে। পুলিশ ‘মশিউর রহমান সম্রাট’ ওরফে সবুজ শেখ নামের এক ভবঘুরেকে গ্রেপ্তার করে তাকে ‘সিরিয়াল কিলার’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ১৬৪ ধারায় দেওয়া তার স্বীকারোক্তিকে কেন্দ্র করে মামলার জট খোলার দাবি করা হলেও, একজন সচেতন নাগরিক বা অপরাধ বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে এই পুরো গল্পটি অনেক বড় প্রশ্নবোধক চিহ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রশ্ন উঠছে, সবুজ শেখ কি আসলেই একজন একক ঘাতক, নাকি সে কোনো শক্তিশালী চক্রের অপরাধের বোঝা নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া এক ‘বলির পাঁঠা’? কারণ হিসেবে অনেক কিছু চিহ্নিত করা যায়। যেমন ভৌগোলিক অসংগতি: থানার নাকের ডগায় ‘অদৃশ্য’ অগ্নিযজ্ঞ! যেকোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ প্রথমেই যে প্রশ্নটি করবেন তা হলো দূরত্ব। সাভার মডেল থানার একেবারে নিকটবর্তী একটি পরিত্যক্ত ভবনে দিনের পর দিন হত্যাকাণ্ড ঘটছে এবং সেখানে লাশ পোড়ানো হচ্ছে, অথচ পুলিশ তার ছিটেফোঁটাও টের পেল না? মানুষের শরীর পোড়ানোর গন্ধ এবং ধোঁয়া অত্যন্ত তীব্র ও স্বতন্ত্র। সাত মাসে একাধিকবার এই কাণ্ড ঘটার পরও পাশের থানার পুলিশ বা স্থানীয় লোকজনের নজরে না আসাটা কি কেবলই কাকতালীয়, নাকি চরম গাফিলতি? এই গাফিলতি ঢাকতেই কি এখন ‘সিরিয়াল কিলিং’-এর রোমহর্ষক গল্প সাজানো হচ্ছে?
একজন ভবঘুরের সীমাবদ্ধতা বনাম অপরাধের নিপুণতা বিষয়টি আরো জটিল করে তুলেছে। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, সবুজ শেখ একজন ভবঘুরে। যার কোনো স্থায়ী আস্তানা নেই, খাদ্যের নিশ্চয়তা নেই, সে কীভাবে অত্যন্ত সুচারুভাবে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে প্রমাণ লোপাট করে? লাশ পোড়ানোর জন্য প্রচুর পরিমাণে কেরোসিন বা পেট্রোলের প্রয়োজন। একজন সহায়-সম্বলহীন ভবঘুরে নিয়মিত এই দাহ্য পদার্থ কোথা থেকে সংগ্রহ করল? পুলিশের বয়ান মতে, সে যুবক এবং বৃদ্ধাদের অনায়াসে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে। এমনকি শনিবার রাতের ঘটনায় একজন যুবক ও একজন তরুণীকে একসাথে পরাস্ত করে হত্যা করা কি একজন নিঃসঙ্গ ভবঘুরের পক্ষে সম্ভব?
অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায়, কোনো ধস্তাধস্তি বা চিৎকারের শব্দ ছাড়াই এমন ‘নিখুঁত’ হত্যাকাণ্ড সাধারণত পেশাদার খুনি বা একাধিক ব্যক্তির দ্বারা সংগঠিত হয়। সাভারের পরিত্যক্ত ভবনগুলো প্রায়শই মাদক কারবারি, ভূমিদস্যু বা স্থানীয় বখাটেদের অভয়ারণ্য হয়ে থাকে। এমন হতে পারে যে, এই ভবনটি কোনো নির্দিষ্ট অপরাধী চক্রের ‘টর্চার সেল’ বা কিলিং জোন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সম্রাট ওরফে সবুজ শেখ হয়তো সেই চক্রের একজন অতি সাধারণ সহযোগী বা ‘ক্লিনার’ ছিল। তার কাজ ছিল অপরাধীদের ফেলে যাওয়া মৃতদেহগুলো পুড়িয়ে প্রমাণ নষ্ট করা। এখন যখন বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে, তখন পুরো চক্রটিকে আড়াল করতে একজন মানসিকভাবে অস্থিতিশীল ভবঘুরেকে ‘সিরিয়াল কিলার’ বানিয়ে মামলাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা কি অসম্ভব? বাংলাদেশে অপরাধ তদন্তের একটি বড় দুর্বলতা হলো ‘১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তি’। পুলিশের রিমান্ডে থাকা একজন ব্যক্তির স্বীকারোক্তি কতটা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত আর কতটা ‘শিখিয়ে দেওয়া’, তা নিয়ে সব সময়ই বিতর্ক থাকে।
অপরাধীকে ‘সাইকো’ বা ‘বিকারগ্রস্ত’ তকমা দেওয়াটা হলো তদন্তের সবচেয়ে সহজ সমাধান। এতে মানুষের কৌতুহল মেটানো যায়, কিন্তু মূল অপরাধী বা মোটিভ আড়ালে থেকে যায়। সিরিয়াল কিলাররা সাধারণত অত্যন্ত নির্জন স্থান বেছে নেয় এবং তারা লাশ গুম করার চেয়ে বরং একটি ‘সিগনেচার’ রেখে যেতে পছন্দ করে। কিন্তু সবুজের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে লাশ পোড়ানোর মাধ্যমে প্রমাণ পুরোপুরি নষ্ট করার চেষ্টা। এটি সিরিয়াল কিলারের চেয়ে ‘পেশাদার খুনি’র বৈশিষ্ট্য বেশি বহন করে।
তাছাড়া, নিহতদের মধ্যে একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী তরুণী এবং অন্যজন অচেনা যুবক। এই ভিকটিম সিলেকশন কি কেবলই সবুজের ‘অনৈতিক কাজের প্রতি ঘৃণা’ থেকে, নাকি এর পেছনে কোনো সামাজিক বা অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব ছিল যা পুলিশ এড়িয়ে যাচ্ছে? একজন ভবঘুরেকে সিরিয়াল কিলার হিসেবে মেনে নেওয়াটা হয়তো আমাদের জন্য রোমহর্ষক একটি গল্প হতে পারে, কিন্তু তা যুক্তির মানদণ্ডে উত্তীর্ণ নয়। এর আগে রসু খাঁকে নিয়েও আমরা দেখেছি নানা গল্প। সম্রাট ওরফে সবুজ রহস্যও কি কি আমার শৈশবের ধঞ্চে ক্ষেতে হারিয়ে যাবে!
Add a Comment