জাতীয়
Published : 05 Feb 2026, 03:17 PM
পৃথিবীতে নারী নিয়ে যতো আলোচনা হয়েছে ততো আর কোনো বিষয় নিয়ে হয়েছে কিনা সন্দেহ আছে। আর নারী বিষয়ক আলোচনার কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে নারীবাদ। সুলেখক আহসান হাবিব লিখেছেন নারীবাদ নিয়ে বংশাইটাইমসে । চার পর্বের ধারাবাহিক এই লেখা পড়তে সঙ্গে থাকুন
৮
আমাদের মত দেশগুলোতে এখনো একটা বিরাট সংখ্যক শিশু (২২%) কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এর অন্যতম প্রধান কারণ মায়ের ওজন কম। এই ওজন কমের কারণ পুষ্টিহীনতা। যখন এইসব মায়েরা গর্ভবতী হয়, তখন প্রয়োজনের তুলনায় এদের ওজন কম থাকে। কিছু মা আছে যারা অতিরিক্ত ওজনে বেশি। এই দুই ধরণের মা কম ওজনের শিশুর জন্ম দিয়ে থাকে। গর্ভবতী হওয়ার পর এরা যা খায় তা নিজেদের প্রয়োজনেই শেষ হয়ে যায়, পেটের বাচ্চার ভাগে যা পড়ে তা তার জন্য যথেষ্ট নয়।
এই যে গর্ভবতী মায়েদের ওজন কম এর কারণ আগেই বললাম পুষ্টিহীনতা, কেন পুষ্টিহীনতা?
কারণ আমাদের মত দেশে সমাজে একটা প্রচলিত ধারণা আছে যে মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের পুষ্টি বেশি দরকার, তাই ভালো ভালো খাবার দেয়া হয় ছেলেদের, মেয়েদের দেয়া হয় কম করে। তাদের ধারণা ছেলেরা শারীরিক ভাবে শক্ত সামর্থ্য না হলে ভবিষ্যতে উপার্জনক্ষম কাজ করবে কি করে? অথচ বিজ্ঞান গবেষণা করে বলছে একটা সুস্থ সবল জাতি নির্মাণ করতে হলে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের বেশি বেশি পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। কারণ পুষ্টির অভাবে যে কম ওজনের বাচ্চার জন্ম হয়, তাদের শারীরিক বৃদ্ধি স্বাভাবিক ওজনের বাচ্চাদের মত হয় না। সব সময় কম হয় এবং মেয়ে শিশুটি যখন বড় হয়ে মা হয় এবং বাচ্চা প্রসব করে, সেটিও কম ওজনের হয়ে থাকে, এটা একটা চক্র, চলতেই থাকে। শুধু তাই নয়, গবেষণায় পাওয়া গেছে যে কম ওজন নিয়ে জন্ম গ্রহণ করা শিশুরা বড় হয়ে জটিল রোগে আক্রান্ত হয়, যেমন হার্টের অসুখ, ডায়াবেটিস, কিডনির অসুখ, পরিপাকতন্ত্রের অসুখ ইত্যাদি।
যদি একটা দেশের ২২% শিশু কম ওজন নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে, তাহলে এর পরিণাম কি ভয়াবহ তা সহজেও অনুমেয়। এই হার এক দশক আগেও অনেক বেশি ছিল। এমডিজি প্রজেক্টের চেষ্টার ফলে এই হার কমে এখন ২২% হয়েছে।
এই যে মেয়ে শিশুদের কম খেতে দেয়া, আমিষ জাতীয় খাবার কম দেয়া এর মূল কারণ পুরুষতান্ত্রিক কুসংস্কার। আমাদের দেশে প্রায় পরিবারে এই প্রথা চালু আছে। শুধু শিশু কেন, মায়েরাও পুষ্টি গ্রহণের দিক থেকে পিতা কিংবা পুরুষদের চেয়ে পিছিয়ে। একটি সুস্থ সবল মানুষের সমন্বয়ে যে জাতি গড়ে ওঠে তার পেছনে থাকে নারীদের পুষ্টির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কি তার উপর। আমরা আমাদের জাতীয় শরীরের দিকে তাকালে দেখি এর ভগ্নদশা। এদের গড় উচ্চতা খুবই কম, নারীর শোচনীয়ভাবে কম। এর জন্য দায়ী রাষ্ট্রীয় ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার চেয়ে যুগ যুগ ধরে চলে আসা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা।
নারীবাদের কাজ প্রতিটি পরিবারে মেয়ে শিশুদের বেশি বেশি খাবার দেয়ার আহ্বান জানানো এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বিপক্ষে বৈজ্ঞানিক সত্য তুলে ধরা।
৯
একটি পরিবারে সবচাইতে নিপীড়িত মানুষটি হচ্ছে নারী। এরপরেই আছে ঐ পরিবারের শিশুরা। নারীটির উপর নিপীড়ন করে পরিবারের সব পুরুষ, এমনকি তার নিজের পুরুষ সন্তানরাও। পুরানো নারীরাও নতুন নারীটির উপর নির্যাতনের লাঠি উঁচিয়ে থাকে সদা সর্বদা। সেই নিপীড়ন 'অধিকার'নামক একটি ছদ্ম পথ দিয়ে আসা যাওয়া করে। যদিও এই অধিকার পুরুষদেরই বানানো একটি মারণাস্ত্র।
পিতা বা স্বামী হচ্ছে পরিবারের সর্বময় কর্তা। তিনি যখন বিয়ে করে কোন নারী ঘরে তোলেন, নারীটির উপর নেমে আসে তখন থেকেই নিপীড়নের খড়গ। প্রেমের বিয়ে হোক কিংবা এরেঞ্জ, সম্পর্ক দাঁড়ায় প্রায় প্রভু ভৃত্যের। স্বামী নির্দেশ দেবে, নারী পালন করবে। স্বামী বাইরে কাজ করবে, নারী ঘরে। রান্না করবে, ঘর গুছাবে, বাড়ির অন্য সদস্যদের জন্য ফাইফরমাশ খাটবে, সন্তান জন্ম দেবে, তাদের মানুষ করবে। এইসব করতে গিয়ে পান থেকে চুন খসলে শাস্তি তাকে পেতেই হবে। নারী শিক্ষিত হলে 'আমাদের পরিবারের বউরা চাকরি করবে না' বলে সিলমোহর মেরে দেয়া হবে। নতুন নারীটি পরিণত হয় একজন বন্দী দাসিতে।
এই নারীটির সবকিছু মুখ বুঁজে সহ্য করে যেতে হয়, কারণ একটাই সে নারী। আর একটি বড় কারণ সে এই পরিবারে একমাত্র সংখ্যালঘু। সংখ্যালঘুরা না চাইলেও সংখ্যাগরিষ্ঠদের দ্বারা নিপীড়িত হবেই। এখানে ঠিক বেঠিকের কোন জায়গা নেই।
এই নারীটি সারাদিন খেটে মরলেও বাইরে থেকে চাকরি বা ব্যবসা করা পুরুষটি তার কাজকে একফোঁটা গুরুত্ব দেয় না। তারা একটাই বাক্য বলে 'সারাদিন বাসায় বসে কি কর'?
সেদিন আমার চেম্বারে একজন নারী এসেছিলেন তার কণ্যাকে নিয়ে, তিনি নিজেও অসুস্থ। তার এলারজীর সমস্যা, হাতটা দেখিয়ে সেসব দেখাচ্ছেন, আমি হাতে একটা দাগ দেখে বললাম- এটা কি?
তিনি বললেন-'এটা নারী জন্মের পাপ'
বুঝতে পেরেও বললাম 'মানে'?
'মানে এটা হেঁসেল ঠেলার দাগ, আগুন উপহার দিয়েছে'
এরপর তিনি নারী হওয়ার জন্য স্বামী এবং পরিবারের অন্য সদস্য কর্তৃক কি ধরণের উপহার(!) পান বলতে শুরু করলেন। সেসব সবাই জানেন, একটি কথা কানে লেগে আছে, স্বামী বাইরে যাবার সময় নাকি বলেন-'তোমার কি কি লাগবে'? মানে কি জানেন ডাক্তার'?
'কি'?
'মানে হচ্ছে রান্নার জন্য কি লাগবে, চাল ডাল লাউ পেঁপে ইত্যাদি। আমি একদিন বললাল- আমার লাগবে একটা নীল শাড়ি, ২ ডজন কাচের চূড়ি, লিপিস্টিক, কানের একজোড়া দুল। কি বলল জানেন- শখ কত? তেল বা মস্লা কি লাগবে তাই বল? বলুন, এসব কি আমার জিনিস'?
আমি চুপ করে শুনলাম। এই চিত্র এই বাংলার প্রায় প্রতিটি ঘরে। চিকিৎসক বলে অনেক ইতিহাস আমাদের শুনতে হয়। নারীর নিজস্ব কোন স্বপ্ন বা চাওয়া নেই, সবকিছুই অন্যের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। অন্য মানে পুরুষ। শুধু পুরুষ নয়, পরিবারের এমনকি নারীরাও এই নতুন আসা নারীর উপর পুরুষতান্ত্রিক নিপীড়ন চালায়। তারাও এক একজন পুরুষ হয়ে ওঠে। এইভাবেই পরিবার হয়ে উঠেছে পুরুষতান্ত্রিক নিপীড়নের এক একটা ইউনিট, তাই গড়ে তুলেছে রাষ্ট্র। আমাদের রাষ্ট্রটি আপাদমস্তক একটি পুরুষ রাষ্ট্র।
নারীবাদের কাজ পরিবার এবং রাষ্ট্রের এই পুরুষ আধিপত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো।
১০
যৌনতার ক্ষেত্রে নারী পুরুষের জৈবিকতায় তেমন কোন পার্থক্য নেই। পার্থক্য শুধু গঠনে, যদিও তারা ভ্রূণাবস্থায় বেড়ে উঠে একই রকম ভাবে। বৃদ্ধির এক সময় যৌনগ্রন্থি থেকে হরমোন নিঃসৃত হতে থাকলে যৌন অংগগুলি আলাদা রূপ নিতে থাকে। নারীর ক্ষেত্রে তৈরী হয় ভগাঙ্কুর (Clitoris), পুরুষের পেনিস। এদের আকার ভিন্ন হলেও এতে যে স্নায়ু এবং রক্তবাহী নালির সংস্থান একই থাকে। ফলে যৌন উত্তেজনা এই দুটি অংগের একই রকম। কারণ যৌন উত্তেজনা নিয়ন্ত্রিত হয় স্নায়ু এবং রক্তবাহী নালী দ্বারা।
তবে পার্থক্য হচ্ছে পুরুষের চরম পুলক(Ejaculation) হয়ে গেলে তার শরীরে নেমে আসে একটা অবাধ্য সময় যাকে ইংরেজিতে বলে Refractory period। এই কাল কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েকদিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়, এর মধ্যে সে যৌনক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে না। কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে এটি আলাদা, একবার চরম পুলকের (Orgasm) পরেও আরও কয়েকবার সে পুলক লাভ করার সক্ষমতা রাখে যদি তার ভগাঙ্কুরকে সঠিকভাবে উত্তেজিত করা যায়। সূতরাং নারীর যৌন পুলক পুরুষের চেয়ে বেশি স্থায়ী এবং ব্যপ্ত।
তাহলে কে তাদের যৌনতাকে দমিয়ে রেখে ঘোষণা করেছে যে নারী যৌনতার দিক থেকে শীতল? কে বলেছে তার দিক থেকে সক্রিয় নয় বরং পরোক্ষ? এটাই সেই পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য যা নারীকে যৌনতাকে ছিনতাই করে নামকরণ করেছে শীতল এবং পরোক্ষ এই নেতিবাচক অভিধায়। অথচ যখন মানুষ সমাজবদ্ধ হয়নি, কোন সামাজিক চুক্তির আওতায় বন্দী হয়নি, যৌনতা ছিল অবাধ এবং সমান সমান। সামাজিক বিবর্তনের ধারায় যখন ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব ঘটলো এবং উতপাদনের হাতিয়ার পুরুষের করায়ত্ত হয়ে পড়লো, পুরুষ প্রথমেই যেটা করলো তা হল নারীর যৌনতার উপর আধিপত্য বিস্তার করলো। প্রকৃতিতে একগামি বা বহুগামি বলে কিছু নেই। এই ব্যক্তিগত সম্পত্তির উপর নিরংকুশ মালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য নারীকে একগামি বলে আখ্যায়িত করে তাকে গৃহে বন্দী করলো। অথচ পুরুষ ঠিকই ঘোষণা করলো যে পুরুষ জৈবিক ভাবেই বহুগামি। এটি পুরুষের ডাহা মিথ্যা।
নারী যদি তার যৌন স্বাধীনতা ফিরে পেতে চায়, উপভোগ করতে চায় পূর্ণ আনন্দ, তাহলে পুরুস্তান্ত্রিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে তাকে লড়াই করতে হবে। এটার মিমাংসা হবে তখনই যখন সমাজ থেকে সম্পত্তির ব্যক্তি মালিকানার উচ্ছেদ হবে এবং সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে।
নারীবাদের কাজ পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম জারি রাখা।
Add a Comment