লিটমুড
Published : 05 Feb 2026, 04:34 PM
বইয়ের জগৎ: পার্কে জীবনের গল্প
বিশুদ্ধ বাতাস, লেকের শান্ত জল আর সবুজ ঘাস। একটি আদর্শ বিকেলের জন্য এর চেয়ে বেশি আর কী লাগে? কিন্তু মালয়েশিয়ার সেলানগরের পুচং এলাকার 'তামান ওয়ায়াসান রিক্রিয়েশনাল পার্কে' হাঁটতে গেলে আপনি এর চেয়েও বিস্ময়কর কিছুর দেখা পাবেন। সেখানে লাঠিতে ভর দিয়ে ৯০ বছরের এক বৃদ্ধ আপনাকে আমন্ত্রণ জানাবেন এক অন্য জগতে, যেখানে ৩০ হাজার বই আপনার অপেক্ষায় রয়েছে।
তিনি লি কিম সিউ। একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, যার কাছে বই হলো আজীবনের সঙ্গী।
লি কিম সিউ-র এই যাত্রার পেছনে জড়িয়ে আছে এক বিয়োগান্তক অথচ সুন্দর স্মৃতি। এক সময় তাঁর নিজের ঘরটিই ছিল বইয়ের সমুদ্র। কিন্তু সহধর্মিনী 'গান'-এর মৃত্যুর পর সেই বিশাল সংগ্রহ একা সামলানো তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। লি বইগুলোকে বাক্সে বন্দি না করে সিদ্ধান্ত নিলেন সেগুলোকে মুক্ত করে দেওয়ার। নিজের পরলোকগত স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা আর বইয়ের প্রতি টানকে এক সুতোয় গেঁথে তিনি শুরু করলেন "লি অ্যান্ড গান লাইব্রেরি কুয়ালালামপুর"।
পাঁচ বছর ধরে লি এই পার্কের ভেতর পাঁচটি 'মিনি লাইব্রেরি' গড়ে তুলেছেন। এগুলো কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক ভবন নয়; কোনোটি কাঠের কারুকাজ করা আলমারি, আবার কোনোটি বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচাতে প্লাস্টিক মোড়ানো সাধারণ বাক্স।
এখানে কোনো নিয়ম নেই, কোনো জরিমানাও নেই। লির দর্শন সহজ:"একটি বই নিন, পড়ুন এবং সময়মতো ফেরত দিয়ে যান।"
লির সংগ্রহে যা আছে:
বইয়ের সংখ্যা: ৩০,০০০-এর বেশি।
ভাষা: ইংরেজি, মালয় এবং চীনা।
ধরণ: ক্লাসিক উপন্যাস, রঙিন কমিকস থেকে শুরু করে জ্ঞানগর্ভ তথ্যমূলক বই।
প্রিয় লেখক: চিউং ইয়াও এবং জিন ইয়ং।
৯০ বছর বয়সে যখন অনেকের বিশ্রাম নেওয়ার কথা, লি তখন সপ্তাহে চার দিন (সোম থেকে বৃহস্পতিবার) তিন ঘণ্টা করে সময় কাটান এই পার্কে। নিজের হাতে বইয়ে সিল মারা, নতুন বই গুছিয়ে রাখা আর পাঠকদের বই নির্বাচনে পরামর্শ দেওয়া—সবই করেন হাসিমুখে। শুধু তাই নয়, পাঠকদের জন্য সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রতিদিন সকালবেলা পার্কের আবর্জনাও পরিষ্কার করেন তিনি।
লির এই উদ্যোগ এখন কেবল বই পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি হয়ে উঠেছে স্থানীয়দের মিলনস্থল। পার্কে আসা দর্শনার্থীরা এখন তাঁর সাথে আড্ডা দেয়, কেউ কেউ নিজের সংগ্রহ থেকে বই দান করে। লির বন্ধু লু আহ কাও ঠিকই বলেছেন, "কাজের প্রতি তাঁর এই নিষ্ঠা অতুলনীয়।" লির এই উদ্যম দেখে এখন অনেক তরুণ এগিয়ে আসছেন তাঁকে সাহায্য করতে।
লি কিম সিউ প্রমাণ করেছেন যে, জ্ঞান ভাগ করে নিলে কমে না, বরং তা মহীরুহে পরিণত হয়। পার্কের সেই সবুজ ঘাসে বসে যখন কেউ বইয়ের পাতায় ডুব দেয়, তখন প্রতিটি অক্ষরের ভাঁজে ভাঁজে বেঁচে থাকে লির ভালোবাসা আর তাঁর স্ত্রীর স্মৃতি।
মূল: মিলি র্যাম
সূত্র: ইন্টারনেট থেকে বংশাইটাইমসের পাঠকের জন্য অনুদিত
Add a Comment