ফিচার
Published : 05 Feb 2026, 03:48 PM
পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে পূর্ব বাংলার নারীদের রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ দেওয়া ছিল প্রায় অকল্পনীয়। কিন্তু মাতৃভাষার ওপর যখন আঘাত এল, তখন সেই শিকল ভেঙে বেরিয়ে এলেন একদল অকুতোভয় নারী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলা থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জের অলিগলি—সবখানে প্রতিধ্বনিত হলো শাড়ি পরা তরুণীদের দৃপ্ত কণ্ঠস্বর। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস কেবল কয়েকজন শহিদের নাম নয়, এটি সেই অসংখ্য নারীরও ইতিহাস যারা রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজপথ রঞ্জিত করেছিলেন।
২১শে ফেব্রুয়ারি: ব্যারিকেড ভাঙার অগ্রবাহিনী
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা তখন পুলিশ ও ইবিআর বেষ্টিত। জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা। সভা শেষে যখন সিদ্ধান্ত হলো ১০ জন করে বের হয়ে ধারা ভাঙা হবে, তখন পুলিশের প্রথম বাধাটি চূর্ণ করেছিলেন নারীরাই।
রওশন আরা বাচ্চুর নেতৃত্বে ছাত্রীদের একটি দল পুলিশের তৈরি করা কাঁটাতারের ব্যারিকেড টপকে বা নিচ দিয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ছাত্রীরা সেদিন যে সাহস দেখিয়েছিলেন, তা অনেক পুরুষ কর্মীকেও উজ্জীবিত করেছিল। পুলিশের লাঠিচার্জে সেদিন আহত হয়েছিলেন রওশন আরা বাচ্চু, সুফিয়া আহমদ, হালিমা খাতুনসহ আরও অনেকে। বাতাসের টিয়ার গ্যাসে যখন নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল, তখনও তাদের হাতে ধরা ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ লেখা প্ল্যাকার্ড।
রাজপথের বাইরে: পোস্টার, অর্থ ও গোপন আশ্রয়
আন্দোলন কেবল মিছিলে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর জন্য প্রয়োজন ছিল ব্যাপক সাংগঠনিক প্রস্তুতি। আর এই প্রস্তুতির বড় একটা অংশ সম্পন্ন হতো লোকচক্ষুর অন্তরালে, নারীদের হাতে।
মমতাজ বেগম: ত্যাগের এক মহাকাব্য
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে নারী নেতৃত্বের কথা বললে নারায়ণগঞ্জের মমতাজ বেগমের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি কেবল আন্দোলন সংগঠিতই করেননি, রাজবন্দি হিসেবে অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেছেন। তার গ্রেপ্তারের খবর শুনে সাধারণ মানুষ যেভাবে পুলিশি বেষ্টনী ভেঙে তাঁকে মুক্ত করতে এগিয়ে এসেছিল, তা ছিল নজিরবিহীন। আন্দোলনের কারণে তাকে বিসর্জন দিতে হয়েছিল নিজের সংসার এবং সামাজিক নিরাপত্তা। কিন্তু বাংলার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন।
কারান্তরালে লড়াই
আন্দোলনের দায়ে গ্রেপ্তার হওয়া নারীদের কারাজীবন ছিল আরও দুর্বিষহ। নাদিরা বেগম, লিলি চক্রবর্তী কিংবা তশরিফুন নেসাদের মতো নেত্রীরা কারাগারে গিয়েও দমে যাননি। জেলের ভেতরেও তারা বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে অনশন করেছেন, প্রতিবাদী গান গেয়েছেন। তাদের এই চার দেয়ালের ভেতরের লড়াই বাইরের কর্মীদের মনে সাহসের সঞ্চার করত।
সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিজয়
ভাষা আন্দোলনের পর যখন ১৯৫৩ সালে প্রথম ‘প্রভাতে ফেরি’র সংস্কৃতি শুরু হয়, সেখানেও নারীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। খালি পায়ে, সাদা-কালো শাড়ি পরে শোকাতুর কণ্ঠে গান গেয়ে তারা প্রমাণ করেছিলেন, এই আন্দোলন কেবল রাজপথের লড়াই নয়, এটি বাঙালির রুচি ও সংস্কৃতির অংশ। এই নারীরাই মূলত পরবর্তীকালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মানসিক ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিলেন।
ভাষা আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ ছিল বহুমুখী। কেউ ছিলেন সরাসরি মিছিলে, কেউ ছিলেন আহতদের সেবায় নার্স হয়ে, আবার কেউবা জেল খেটেছেন বছরের পর বছর। তারা কেবল সহযাত্রী ছিলেন না, তারা ছিলেন আন্দোলনের চালিকাশক্তি।
Add a Comment