মুক্তগদ্য
Published : 27 Dec 2025, 06:10 PM
লাবণ্য প্রভা'র অকবিতাসমূহ
১
আমার কবিতাগুলো কখনো কবিতা হয়ে উঠেনি। রয়ে গেছে বিষয়-ভাবনার ছাঁচে। কাওরান বাজারেই থাকি আটঘণ্টা। দেখি, রোদে ও অন্ধকারে কালো কালো ঘাম ঝরে তাহাদের। বেদনার ঝুড়ির ভেতর ঘুমেরা কুণ্ডুলি পাকায়। খিদের নামে তবে খেয়ে ফেলে আঁঠার ঘ্রাণ! কবিতাগুলো থেকে তাই বেলি ফুল ঝরে না। নেই নয়নতারার বিভাও। বিবর্ণ সকালে ঘৃতকুমারির রসের সঙ্গে তারা কথা বলে প্রান্তিক ভাষায়। কবিতার নামগুলো হয়ে যায় ‘মফিজ’।… মফিজ, মফিজ বলে বাসগুলো ডাকে। কবিতা ও মফিজ-সমগ্র বাংলাদেশ ভ্রমণ করে।
.
২
তুমি বলো, অতোদূর থেকে কথা বলো না। ছুঁতে পারি না। যখন কাছে ছিলে তখন সূর্যাস্তে ঠিকই দেখতাম দূর পাহাড়ের গায়ে পেখম মেলেছে একগুচ্ছ রোদ। তখন আমি আর বাতাস ভাষাবদল করতাম। গাছেরা আমার কথা আর আমি বাতাসের কথা বুঝতে পারতাম। সারাদিন অজস্র কথার বুননে একটা নকশীকাঁথা টানিয়ে দিতাম আকাশে। তুমি চলে গেছো। নগরীর বৃষ্টিবৃক্ষরা কাঁদতেও ভুলে গেল। যেন একটা অন্ধকার, একটা আলো-আঁধারি ভোর তোমায় নিয়ে গেল চিরতরে; দূরের নগরে। সেই থেকে কেবল মৃত্যু আমায় ডাকে। বাসে, শপিংমলে, চুড়িহাট্টার আগুনে আমি কংকাল হয়ে যাই। পোড়া মানুষের সঙ্গে গল্প করি। তাদের সঙ্গে আলাপ করতে করতে আমার জিহ্বা খসে গেছে। তাই তুমি আমার কথা শুনতে পাও না।
.
৩
আমার হাতের তালুতে কোনো রেখা নাই। তোমার সঙ্গে জীবন বদল করে কিছুটা ভাগ্য কিনেছিলাম। এখন চলে যাচ্ছি শূন্য হাতে। এ-হাতে আর কোনো চোখ ছুঁয়ে দেখবো না। চোখের কথা বলতেই মনে পড়ল, পাথরের একজোড়া চক্ষু ছিল আমার। মানুষের কদর্যমুখ দেখতে হবে বলে তুমি, কর্ডোভা নগরীর পাথরের মূর্তি থেকে খুলে এনেছিলে। তুমি বলতে, 'অপরিষ্কার মনুষ্য সমাজে চক্ষু রেখো না, মুনা। মানুষ বাজারে যায়। বাজারে বাজারে পশুর মগজ।'
.
৪
পৃষ্ঠাগুলো খুলে দিয়েছি। বই থেকে পৃষ্ঠা খুলে জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছি। খোলা জানালা দিয়ে পশুর গন্ধ ভেসে আসে। মনে পড়ে, বাবার প্রিয় ছিলাম বলে তিনি আমায় কোরবানি দিয়েছিলেন, অট্টাশির বন্যায়। নারী বলে, বাবার কোরবানি জায়েজ করেনি মহল্লার ইমাম। তাতে কিছুই যায় আসে না। বাবা আমায়, কোরবানি করে ফেলেছেন। তখন থেকে আমি আর মানুষ থাকি না। একভোরে জবাফুল হয়ে ফুটে উঠলাম। তুমি তো জানোই, জবা আর মৃত্যু কেমন করে এক হয়ে যায়। আদতে আমি মরেই যাই। তবু, হাঁটি, ফিরি, বাজার করি। সবজি ও কচুশাক কিনি, কিংবা বাজারে বাজারে ফেরি করি ঠাণ্ডা মৃত্যু।
আমার কোভিড-আক্রান্ত কবিতা
দাঁতের নিচে কয়েক টুকরো দাঁত ভাঙতে ভাঙতে ফেসবুক চালাই। স্ক্রল করে নিচে যাই, ওপরে উঠি। আমাদের লিফটে লেখা আছে ওপরে উঠতে আল্লাহ আকবর, নিচে নামতে সুবহানাল্লাহ। আমি সুবহানাল্লাহ বলে নিচে নামতে নামতে কবি সাহিত্যিকদের মাহফিল দেখি, নিজেকেই বিনির্মাণ করি। আমার কোভিড-আক্রান্ত কবিতাগুলো ফেসবুকে জমা রাখি।
২.
জলের তলদেশে ফড়িংয়ের সভা বসেছিল। তাকে ঘিরে আমাদের মৃত বন্ধুরা। তারা সবাই ফিরে গেছে। পৃথিবী আলো করে তারা চলে গেছে নিজস্ব শহরে। ভাঙা সূর্য প্রদক্ষিণের কথা আমার আর মনে পড়ে না
। বাসের জন্য যে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতাম, তা-ও ভুলে গেছি। এখন পথের সামনে লাইন দাঁড়িয়ে আছে রাজস্থানের উটের মতো। তার দীর্ঘ গ্রীবায় সময় জমে জমে পাথর। অমন পাথর দেখলে কেবলই সীতাকুণ্ড পাহাড়ে বাস করতে ইচ্ছে হয়। বাবা আমায় ছোট্ট একটা পাহাড় কেনে দেবে বলেছিল। বাস করতে হলে পাহাড় কিনতে হবে কেন সত্যি বুঝি না আমি! সাগর-নদী-পাহাড় কি কেনা যায় কখনো!
যাই, বলেই তুমি মিলিয়ে গেলে নীল নশ্বরে
৩.
সারা দিন ফেসবুকেই থাকি। সেখানেই জনসভা, মানববন্ধন করি।
পরিবেশবাদী মাহফিলে বক্তৃতা দিই। তোমার নজরে পড়ব বলে ঘন ঘন প্রোফাইল পিক বদলাই।
অথচ ভালোবাসার প্রশ্নে তুমি সু চির মতো নির্বিকার।
৪.
এই সব চিখ্ চিৎকার তুমি কানে নিয়ো না প্রিয়তম!
তার চেয়ে চলো শুনি মিডনাইট সোনাটা। ওই মুভিটা দেখেছিলে! ওই যে চ্যাপলিনের ডগস লাইফ!
আহা! আমাদের কুকুর জীবন!
গলার শেকলটা কোথায় যে বাধা ঠিক বুঝতে পারি না...
লাবণ্য প্রভা'র অগদ্য
০১
কুকুর বিশ্বস্ত হয় জানি, কিন্তু শাকিলা মমতাজ একটি অবিশ্বস্ত কুকুর পুষেছিল
তারা কোনো এক নিঝুম সন্ধ্যায়
মৃত উনুনের পাশে বসে কয়েক পেয়ালা চা পান করেছিল।
আর তখন ভরা পূর্ণিমার রাতে আমাদের বংশাই নদে অজানা পানসি ভেসে বেড়াত
পানসিতে নীল পরীরা নৃত্য করে।
কেবল বেল্লাল মুন্সী দেখেছিল সেই পরীর নৃত্য
আর সেই গুপ্তকথা মানুষেরা জেনে গেলে ফড়িংয়েরা আত্মাহুতি দেয়
ফুট নোট: ১
একেকটি ভূমিকম্পের পর প্রেমিক-প্রেমিকাদের পরস্পরকে আলিঙ্গন করা উচিত
ফুটনোট ২:
মিনতি মাসী ইন্ডিয়া চলে গেছে
পাথরাইল এখন একটি এনজিও তাঁতগ্রাম
০২.
কোথাও কি পাড় ভাঙছে?
মিহি কান্নার ধ্বনি শুনতে পাচ্ছ!
তীর্থঙ্কর! তিরিশ লক্ষ বছর ধরে কেবল হাঁটছিই
পঙ্খীরাজ কোথায়! অলৌকিক উদ্যানে ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমী আর কতকাল ভবিতব্য বলে যাবে!
তুমি বলো,
প্লিজ, স্টপ ক্রাইং মাই ডিয়ার! আই হেইট য়্যু মোর দ্যান মাগট!
০৩
উৎসর্গ :
প্রিয় শূকর সমীপেষু;
প্রতিদিনই তো ফেরেন
একদিন না হয় ভুলে গেলেন বাড়ি ফেরার পথ
প্রাতিষ্ঠানিক দরোজার বাইরে রোদের উৎসব,শৈশবের বাঁশি
কতোদিন বাড়ি ফিরি না আমি!
০৪
তোমাকে ভালোবাসি বললেই তুমি কসাই হয়ে ওঠো। সব্জীবাজারের নিয়ম ভঙ্গ করে তুমি ছানবিন করো পবিত্র পরিখা। কোনো একদিন অনন্ত অন্ধকারের নিচে দাড়িয়ে একমুঠো খই ছড়িয়েছিলো আমার দাদীআম্মা। সেই থেকে অন্ধ নক্ষত্রগুলো জ্বলে যাচ্ছে আপন নিয়মে। দ্যাখো, আমাদের ডাইনিং টেবিলে হেসে উঠছে পার্সলে লীফ; কচি কচি প্রজাপতি
পরমাঙ্কের ভাঁজ হতে বেরিয়ে এসো প্রিয় শূকর আমার। মহাকালের পাঁকে চলো আরো একবার আকণ্ঠ ডুবে যাই।
তুমি মোটেও আমার অন্যসব প্রেমিকদের মতো নও। তোমার শরীর থেকে সোঁদা মাটির গন্ধ ভেসে আসে কেন বলোতো! গর্ভবতী নারীদের মতো তখন আমার মাটি খাওয়ার ইচ্ছে জাগে।
জেনে রেখো, আমি সেই শবরীবালা, হাড়ের মন্ত্রে বশ করি বন্য শূকর...
০৫
এমন মাগুরগুঁড়িয়ানা দিনে তোমার শ্বাসকষ্ট হয়
তোমার শ্বাসকষ্ট হয় বলে আমাদের তাবৎ যুদ্ধবিমানের মন খারাপ হয়। তারা ঠিকমতো চক্কর দিতে পারে না। নগর নারায়ণগঞ্জের আম্মাজানের দেহরক্ষীরা ছটফট করে। তারা আম্মাজানকে একমুহূর্ত চোখের আড়াল করতে চায় না। তুমি এসব কিছুই দেখতে পাও না। তুমি মগ্ন তোমার নিউজরুমে। একটা ব্রেকিং তোমার দরকার। অথচ আমি ব্রেকিং নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি তো আছিই। খুলনার সরকারী সদনের নৈশ প্রহরী তিন তিনটি শিশুকে ধর্ষণ করেছে। মামলা হয়নি বলে তোমার কাছে তা গুরুত্ব পায় না। সিঙ্গেল কলাম ছেপে দাও। শিশুগুলোর মা বাবা নেই বলে কি তাদের ধর্ষক বেঁচে যাবে, তীর্থঙ্কর!
কতো আজেবাজে বিষয়কে ইস্যু করো তোমরা। তোমাদের ইশারায় সব টালমাটাল হয়ে যায়
ওই অনাথ শিশুগুলোর কী দোষ তীর্থঙ্কর! কেন কেঁপে ওঠে না আল্লাহর আরশ!
তুমি ডাকো, মোনা বাইরে এসো।
জানি, মফস্বল সংবাদদাতা বলে আমি কোনোদিনই তোমার নিউজরুমে ঢুকতে পারবো না।
০৬
জ্যোৎস্নার ভেতর কর্তিত প্রজ্ঞার পতন। কোথাও কোনো দর্শন-চিহ্ন নেই। তার ভ্রমণবিলাসী কণ্ঠস্বর আমায় বিহ্বল করে। ঘুমাতে যাওয়ার আগেও তার অনির্বাণ কথামালা ডেকেছিল। ডেকেছিল বৃক্ষের পাণ্ডুলিপি হাওয়ায় হাওয়ায়। অথচ হৃদকৌটায় রোগমুক্তির শল্যবিদ্যা গোপন রাখে সে। কোথাও কিছু অবশিষ্ট নেই। তবু, একবার বিন্যস্ত হতে চাই। বিপরীত অন্তর ধুয়ে ফিরে এসো। তুমিই তো সেই প্রজ্ঞাবান পাখি। উঁচু হতে নেমে এসো মর্ত্যে পুনর্বার। অতঃপর জেনে রাখো, কুয়াশা পাঠচক্রে সব বৃক্ষের ডাকে সাড়া জাগে না।
০৭
কতোকাল প্রতীক্ষায় আছি। প্রাণটুকু ধরে আছি হাতের মুঠোয়। মনোবিকলন কেন্দ্রের পথটুকু চিনে নাও। গলার রশিটা ক্রমশ গেঁথে যাচ্ছে তীর্থঙ্কর! তুমি ছুঁয়ে দিলেই তো নিশ্চিন্তে মরে যাই...
০৮
কাশিমপুর কারাগারে দমবন্ধ হয়ে আসছে। শুনলাম আগামীমাসে চালু হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড়ো কারাগার। ভাবছি কেরানিগঞ্জেই শিফট হয়ে যাবো। সেখানে উন্নতজাতের গোলাপ ফোটাবো। অথচ তুমি বলো, কোথাও যেতে হবে না, আমাদের প্রতিটি বাড়ি একেকটি কারাগার হয়ে উঠছে।
০৯
পৃথিবীর সবচেয়ে আনন্দময় স্মৃতি :
আব্বা টিউবওয়েলের পানি ঘটিতে ভরে গায়ে ঢালছেন। আর সাত বছরের আমি আব্বাকে জড়িয়ে আছি। আমার গায়ে শান্তির ধারা গড়িয়ে পড়ছে।
তুমি কি জানো, আমার বাবার ছিল উজ্জ্বল নীরবতা!
তিনি জানতেন, কী করে ভালোবেসে নীরব থাকতে হয়।
১০
একেকটা পথ পরিক্রমণ শেষে, পথের শেষে এসে দাঁড়াই। অতঃপর পাঠ করি তোমার বাণী। হে আমার প্রিয়তম, আমি তোমার একান্ত দর্শন প্রত্যাশী। হায় , ক্যাসিনো ঘড়ি ও আমাদের রেড লিফ সময় ...
Add a Comment