ফিচার
Published : 01 Jan 2026, 06:44 AM
বেগম খালেদা জিয়া । একটি নাম একটি প্রতিষ্ঠান।
গত চার দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে যে নামটি উজ্জ্বল তিনি খালেদা জিয়া। এক শান্ত-স্নিগ্ধ সাধারণ গৃহবধূ থেকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর এই উত্তোরণ কোনো অংশেই মহাকাব্যেও চেয়ে কম নয়।
প্রতিকূলতায় তরী বেয়ে চলা, চরম ব্যক্তিগত শোককে শক্তিতে পরিণত করার শিক্ষা আসলে তাঁর কাছ থেকে নেয়া যায়।
সিল্ক-শিফন শাড়ি পরিহিতা ফ্যাশন সচেতন এক নারী ধর্মীয় দেশে বাতাবরণের দৃঢ় ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়েছেন সর্বসমক্ষে।
৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, তারিখে ৮০ বছর বয়সে তাঁর মহাপ্রয়াণে কেবল একটি রাজনৈতিক দল তার অভিভাবক হারিয়েছে তাই নয়, সমাপ্তি হলো বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের।
‘পুতুল’ থেকে রাজনীতির ময়দানে
১৯৪৬ সালে জলপাইগুড়িতে জন্ম নেওয়া খালেদা খানমের ডাকনাম ছিল ‘পুতুল’। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে মেজ পুতুল ছিলেন পরিবারের সবার আদরের। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎকালীন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর তিনি পরিচিত হন খালেদা জিয়া নামে। দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোকে নিয়ে তাঁর পৃথিবী ছিল একান্তই ঘরোয়া।
জিয়াউর রহমান যখন সেনাপ্রধান থেকে রাষ্ট্রপতি হলেন, তখনও খালেদা জিয়াকে কোনো রাজনৈতিক মিছিলে বা সভায় দেখা যায়নি। পর্দার আড়ালে থেকে কেবল ছায়ার মতো স্বামীর পাশে থাকতেন তিনি। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমান নিহত হলে ওলটপালট হয়ে যায় সব। শোকে পাথর খালেদা জিয়া তখন কেবলই একজন বিধবা নারী। দুই সন্তানের জননী।
সেই সময় বিএনপি যখন নেতৃত্বহীনতায় ভুগছিল, তখন নেতাকর্মীদের আকুল আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি রাজনীতিতে পা রাখেন।
শুরু হয় এক নতুন ইতিহাসেরপদযাত্রা।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দৃঢ়তার প্রথম বড় পরীক্ষা ছিল আশির দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। ১৯৮৩ সালে তিনি দলের চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন এবং ৭-দলীয় ঐক্যজোট গঠন করে রাজপথে নামেন। সেই সময়ে সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া চষে বেরিয়েছেন।
১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়া বা না নেওয়া নিয়ে যখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বিধা ছিল, খালেদা জিয়া তখন কঠোর অবস্থানে ছিলেন। তাঁর সেই অনমনীয় ভূমিকার কারণেই তিনি দেশবাসীর কাছে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত হন। দীর্ঘ নয় বছরের সংগ্রামের পর ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদের পতন ঘটে এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনে অভাবনীয় জনসমর্থন নিয়ে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
খালেদা জিয়ার শাসনামলের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো বাংলাদেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ফিরিয়ে আনা। দীর্ঘ ১৬ বছর পর তাঁর নেতৃত্বেই রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা বদলে সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। তাঁর আমলেই নারী শিক্ষার প্রসারে অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু হয়, যা বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছিল।
খালেদা জিয়ার চরিত্রের সবচেয়ে দৃঢ় দিকটি ফুটে ওঠে ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। সে সময় তথাকথিত ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার মাধ্যমে তাঁকে দেশত্যাগে বাধ্য করার জন্য সর্বোচ্চ চাপ দেওয়া হয়েছিল। গুজব ছড়িয়েছিল তিনি সৌদি আরবে নির্বাসনে যাচ্ছেন। কিন্তু কারাগারের ভেতরে থেকেও তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন:
"দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। এই দেশ, এই দেশের মাটি-মানুষই আমার সবকিছু। আমি বিদেশে যাব না।"
গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তাঁর এই অবস্থান কেবল নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি তাঁর অগাধ বিশ্বাসের প্রতিফলন ছিল। দুই ছেলেকে গ্রেপ্তার, অমানুষিক নির্যাতন—কিছুই তাঁকে টলাতে পারেনি।
খালেদা জিয়ার জীবন যতটা বীরত্বের, ততটাই ট্র্যাজেডির। ১৯৮১ সালে স্বামী হারানো দিয়ে শুরু, এরপর ২০১৫ সালে গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় তিনি তাঁর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর খবর পান। এক মা হিসেবে এর চেয়ে বড় শোক আর হতে পারে না। বড় ছেলে তারেক রহমানও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়ে দূর প্রবাসে।
কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি হারিয়েছেন তাঁর মা তৈয়বা মজুমদারকে। স্বজনহারা এই দীর্ঘ জীবনে তিনি কখনও জনসমক্ষে বিলাপ করেননি।
২০১৮ সাল থেকে তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়টি ছিল জেল-জুলুম আর অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই। দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার পর অসুস্থতার কারণে তিনি গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় কার্যত গৃহবন্দী জীবন কাটান। লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস ও হৃদরোগের মতো জটিল অসুখ তাঁর শরীরকে দুর্বল করলেও মনোবল ভাঙতে পারেনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটলে খালেদা জিয়া চূড়ান্তভাবে মুক্তি পান। দীর্ঘ কারাবাস ও শারীরিক নিগ্রহের পর ৭ আগস্টের সমাবেশে তাঁর ভিডিও বক্তব্যটি ছিল পুরো জাতির জন্য এক মহৌষধ। তিনি প্রতিশোধের বদলে ক্ষমার কথা বলেছিলেন:
"আসুন, ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়; ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি।"
Add a Comment