ফিচার
Published : 01 Jan 2026, 08:59 AM
আমরা হয়তো অনেকেই জানিনা তাঁর নাম। তিনি লিস মিটনার। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যাঁর নাম।
আজকের পদার্থবিজ্ঞানের যে ভিত্ত তার পেছনে রয়েছে এই নারীর অসামন্য অবদান। তার মেধা আর জীবন।
লিস মিটনার—যাকে বলা হয় নিউক্লীয় বিভাজনের প্রকৃত ব্যাখ্যাতা। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তার নাম যতটা উজ্জ্বল হওয়ার কথা ছিল, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ আর রাজনীতির মারপ্যাঁচে তা ঢাকা পড়ে গিয়েছিল দীর্ঘকাল।
১৮৭৮ সালের ৭ নভেম্বর। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় এক ইহুদি পরিবারে জন্ম নেন লিস। পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে ১৮৭৯ সালকে বলা হয় ‘অলৌকিক বছর’, কারণ এ সময়েই জন্মেছিলেন আইনস্টাইন, ম্যাক্স ফন লাউয়ে এবং অটোহ্যানের মতো মহীরুহরা। লিস জন্মেছিলেন এই সময়ের মাত্র দেড় মাস আগে। তার শিক্ষক বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্লাংক রসিকতা করে বলতেন, লিস মিটনার এতটাই কৌতূহলী ছিলেন যে ১৮৭৯ সাল আসা পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করতে পারেননি!
কিন্তু সেই কৌতূহলের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। সেই সময়ে ইউরোপে মেয়েদের উচ্চশিক্ষার পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। লিস ছিলেন ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জনকারী দ্বিতীয় নারী। ১৯০৭ সালে যখন তিনি বার্লিনে পাড়ি জমান, তখন তার সামনে ছিল এক নতুন জগত এবং নতুন কিছু বাধা।
কার্পেন্টারি শপ থেকে গবেষণাগার: লিঙ্গ বৈষম্যের কবলে মেধা
বার্লিনে লিসের পরিচয় হয় রসায়নবিদ অটো হ্যানের সাথে। তাদের এই জুটি বিজ্ঞান জগতে অজেয় হয়ে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু লিস ছিলেন নারী। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে তখন মহিলাদের প্রবেশাধিকার ছিল না। লিসকে কাজ করতে হতো একটি পুরনো ‘কার্পেন্টারি শপে’ বা কাঠের গুদামে। এমনকি তাকে মূল ভবনে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়নি, পাছে তার সৌন্দর্য ছাত্রদের মনযোগ বিচ্যুত করে!
পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এই সংকীর্ণতা লিসকে দমাতে পারেনি। দিনের পর দিন অপদস্থ হয়েও তিনি তার গবেষণা চালিয়ে গেছেন। ধীরে ধীরে তিনি নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেন এবং কাইজার ভিলহেল্ম ইনস্টিটিউটের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের পরিচালক পদে আসীন হন।
ফিশন বিক্রিয়া: যে আবিষ্কার পাল্টে দিল পৃথিবী
লিস মিটনার এবং অটোহ্যান প্রায় ৩০ বছর একসঙ্গে কাজ করেছেন। ১৯৩৮ সালে যখন নাৎসিরা জার্মানি দখল করে, ইহুদি হওয়ার কারণে লিসকে পালিয়ে সুইডেনে আশ্রয় নিতে হয়। কিন্তু দূরে থাকলেও হ্যানের সাথে তার চিঠিপত্র আদান-প্রদান বন্ধ হয়নি।
অটো হ্যান ল্যাবে ইউরেনিয়াম নিয়ে পরীক্ষা করছিলেন, কিন্তু ফলাফলের কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। লিস সুইডেনে বসে তার মেধা ও তাত্ত্বিক জ্ঞান দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন যে, ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস ভেঙে যাচ্ছে এবং প্রচুর শক্তি নির্গত হচ্ছে। তিনি এবং তার ভ্রাতুষ্পুত্র অটো রবার্ট ফ্রিশ্চ এই প্রক্রিয়ার নাম দিলেন 'নিউক্লীয় ফিশন'।
নোবেল বঞ্চনা এবং এক ‘উল্টে যাওয়া পুতুল’
বিজ্ঞানের ইতিহাসে ১৯৪৪ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কারটি ছিল সবচেয়ে বড় বিতর্কের একটি। যে আবিষ্কারের পেছনে লিস মিটনারের মস্তিষ্ক কাজ করেছে, সেই আবিষ্কারের জন্য নোবেল দেওয়া হলো কেবল অটো হ্যানকে। লিসকে করা হলো চরম উপেক্ষা। কেবল নারী হওয়ার কারণে এবং ইহুদি পরিচয়ের ভারে তাকে এই প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত করা হয়।
নির্বাসিত জীবনের এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, “নিজেকে আমার ঝড়ে উল্টে যাওয়া পুতুলের মতো মনে হয়।” এই বাক্যটি লিসের জীবনের নিঃসঙ্গতা আর বঞ্চনার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। তিনি সুন্দরী ছিলেন, প্রতিভাময়ী ছিলেন, কিন্তু জীবনের সবটুকু বসন্ত তিনি উৎসর্গ করেছিলেন বিজ্ঞানের ল্যাবরেটরিতে। সংসার পাতা হয়নি তার, নিঃসঙ্গতা ছিল তার আমৃত্যু সঙ্গী।
নৈতিকতার প্রশ্নে আপসহীন এক নারী
লিস মিটনারের আবিষ্কারকে কাজে লাগিয়েই পরবর্তীতে তৈরি হয়েছিল পারমাণবিক বোমা। কিন্তু লিস নিজে ছিলেন কট্টর শান্তিবাদী। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, “আমি বোমার কাজের সাথে যুক্ত থাকব না।” বিজ্ঞানের ক্ষমতা যখন ধ্বংসের পথে পরিচালিত হচ্ছিল, তখন লিস তার মানবিকতা হারাননি।
শেষ বেলা ও উত্তরসূরির স্বীকৃতি
জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি কাটিয়েছেন ইংল্যান্ডের কেমব্রিজে তার ভ্রাতুষ্পুত্র রবার্ট ফ্রিশ্চের সাথে। ১৯৬৮ সালের ২৭ অক্টোবর ৮৯ বছর বয়সে নিভে যায় এই উজ্জ্বল প্রদীপ। তার কবরের ফলকে লেখা আছে— “লিস মিটনার: এমন একজন পদার্থবিজ্ঞানী যিনি কখনও তার মানবিকতাকে হারান নি।”
আজ পৃথিবী তাকে দেরিতে হলেও সম্মান দিচ্ছে। পর্যায় সারণির ১০৯ নম্বর মৌলটির নাম রাখা হয়েছে ‘মিটনেরিয়াম’ ।
লিস মিটনার কেবল একজন বিজ্ঞানী ছিলেন না; তিনি ছিলেন লড়াইয়ের এক প্রতীক। লিঙ্গবৈষম্য, বর্ণবাদ আর রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও একজন মানুষ কতটা অবিচল থাকতে পারে, লিস তার জ্বলন্ত উদাহরণ। ইতিহাসের পাতায় অটো হ্যানের নাম বড় করে লেখা থাকলেও, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের হৃদস্পন্দনে আজও লিস মিটনারের মেধা অনুরণিত হয়।
Add a Comment