ফিচার
Published : 03 Jan 2026, 10:24 AM
রাজনীতি এক অদ্ভুত পথচলা। যারা এই পথে হাঁটেন তারা যেন সার্কাসের রিংয়ের সরু দড়িটার ওপর পা ফেলার জন্যই জন্ম নেন। একসময় পথ থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া। লক্ষ্য তো ওটাই। জনমানুষের কল্যাণের অঙ্গীকার হারিয়ে যায় ক্ষমতার দম্ভে। কখনো প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে
ক্ষমতার শিখর থেকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ইতিহাস যেমন পুরনো, তেমনি রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানদের বিচারিক প্রক্রিয়ায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার ঘটনাও বিশ্বে বিরল নয়। সম্প্রতি মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সাবেক সরকারপ্রধান এ ধরনের দণ্ডে দণ্ডিত হলেন।
তবে ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, শেখ হাসিনাই প্রথম নন। বিভিন্ন কালখণ্ডে বিশ্বের অন্তত ৪৭ জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানকে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫ জনের দণ্ড কার্যকর হয়েছে, বাকিদের ক্ষেত্রে দণ্ড হ্রাস পেয়েছে কিংবা তারা পালিয়ে রক্ষা পেয়েছেন।
ক্ষমতা ও পতন: ইউরোপের সেই আলোচিত বিচার
রাষ্ট্রপ্রধানদের মৃত্যুদণ্ডের ইতিহাসে রোমানিয়ার নিকোলাই চসেস্কুর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৬৭ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত দীর্ঘ শাসনামলে তিনি ছিলেন দেশটির দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। কিন্তু ১৯৮৯ সালের গণ-আন্দোলনে তার পতন ঘটে। সংক্ষিপ্ত এক বিচারে অর্থনৈতিক অন্তর্ঘাত ও গণহত্যার দায়ে তাকে এবং তার স্ত্রী এলেনাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
চসেস্কুর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের সহযোগী হওয়ার অপরাধে রোমানিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইয়ন আন্তোনেস্কুকেও ১৯৪৬ সালে একই কায়দায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। একইভাবে ইতালির ফ্যাসিস্ট নেতা বেনিতো মুসোলিনিকে ১৯৪৫ সালে পালানোর সময় ধরে ফেলে গুলি করে হত্যা করা হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পরবর্তী বিচার
বিশ্বযুদ্ধের পর নাৎসি জার্মানির মিত্র দেশগুলোর অনেক সরকারপ্রধানকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী আইভান বাগরিয়ানোভ, দোব্রি বোঝিলোভ এবং বগদান ফিলভকে ১৯৪৫ সালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। যদিও বহু বছর পর ১৯৯৬ সালে বুলগেরিয়ার আদালত তাদের দণ্ডাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়। নরওয়ের ভিডকুন কুইসলিং-ও নাৎসিদের সহযোগিতার দায়ে ১৯৪৫ সালে ফায়ারিং স্কোয়াডে দণ্ডিত হন।
মুসলিম বিশ্বের আলোচিত তিন ফাঁসি
মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে তিনটি মৃত্যুদণ্ড বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল: ১. জুলফিকার আলী ভুট্টো (পাকিস্তান): ১৯৭৯ সালে এক বিতর্কিত বিচারে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র ও হত্যার চেষ্টার অভিযোগে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।
২. সাদ্দাম হোসেন (ইরাক): ২০০৩ সালে মার্কিন আগ্রাসনে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিশেষ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০০৬ সালে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
৩. মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহ (আফগানিস্তান): ১৯৯৬ সালে তালেবানরা ক্ষমতা দখলের পর তাকে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
এ ছাড়া ইরানের শাহের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী আমির-আব্বাস হোভেইদাকেও ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
রায় কার্যকর হয়নি যাদের
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সব শাসকের ভাগ্য এক ছিল না। দক্ষিণ কোরিয়ার চুন দু-হুয়ান, ফিলিপাইনের ফার্দিনান্দ মার্কোস কিংবা মধ্য আফ্রিকার জাঁ-বেদেল বোকাসা—এদের সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা আপিলের প্রেক্ষিতে তাদের সাজা হ্রাস করা হয়। মার্কোস ও চুন দু-হুয়ান স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট সেলাল বায়ারকেও ১৯৬১ সালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও পরে তা কমিয়ে দেওয়া হয়।
প্রাচীন ও মধ্যযুগের শাসকরাও বাদ যাননি
ইতিহাসের এই তালিকায় শুধু আধুনিক শাসকরাই নেই। সপ্তদশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম চার্লস, অষ্টাদশ শতাব্দীতে গিলোটিনে ফরাসি সম্রাট লুই ষোড়শ, এমনকি চীনের প্রাচীন কিন ও সং রাজবংশের সম্রাটরাও রাজনৈতিক বিবাদ বা অপরাধের দায়ে প্রাণদণ্ড পেয়েছেন।
এক নজরে উল্লেখযোগ্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শাসকবৃন্দ:
Add a Comment