ফিচার
Published : 10 Jan 2026, 03:32 PM
রেজা শাহ পাহলভি থেকে রেজা পাহলভি: ইতিহাসের আবর্তন?
উত্তাল ইরান। রাজপথে এখন শুধু স্লোগান নয়। নানা ভাষায় চলছে প্রতিবাদ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওচিত্রে দেখা যাচ্ছে, ক্ষুব্ধ ইরানি নারীরা দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবিতে আগুন ধরিয়ে সেই অগ্নিশিখা দিয়ে সিগারেট ধরাচ্ছেন। ইরানের কঠোর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আবহে এটি কেবল অবমাননা নয়, বরং এক চরম বিদ্রোহের বহিঃপ্রকাশ।
আড়াই হাজার বছরের রাজতন্ত্র উপড়ে ফেলে যে ইসলামি বিপ্লব এসেছিল, আজ ৪৬ বছর পর সেই ব্যবস্থার ভিত্তি কি তবে নড়ে উঠছে? প্রশ্ন উঠছে—ইরানের ইতিহাস কি তবে রেজা শাহ পাহলভি থেকে শুরু হয়ে আবার বর্তমানের রেজা পাহলভিতে এসে থমকে দাঁড়াবে?
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি ‘শ্বেত বিপ্লব’-এর মাধ্যমে ইরানকে একটি আধুনিক ও পশ্চিমা ধাঁচের রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু উন্নয়নের আড়ালে একনায়কতান্ত্রিক মনোভাব, ব্যাপক দুর্নীতি এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির অতি-অনুপ্রবেশ ধর্মপ্রাণ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করে। এই ক্ষোভকে পুঁজি করেই ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে সূচিত হয় ইসলামি বিপ্লব। অবসান ঘটে দীর্ঘ আড়াই হাজার বছরের রাজতন্ত্রের।
১৯৭৯ সালের ১ এপ্রিল ইরানকে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রবর্তন করা হয় ‘বেলায়েত-এ ফকিহ’ বা ধর্মতাত্ত্বিক অভিভাবকত্বের এক অনন্য শাসন কাঠামো। যেখানে জনগণের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট থাকলেও চূড়ান্ত ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে ‘সর্বোচ্চ নেতা’ বা সুপ্রিম লিডারের হাতে।
বিগত চার দশকে ইরান বহু চড়াই-উৎরাই পার করেছে। নব্বইয়ের দশকে মোহাম্মদ খাতামির হাত ধরে সংস্কারের হাওয়া বইলেও কট্টরপন্থীদের বাধার মুখে তা বারবার থমকে গেছে। বর্তমানে দেশটি এক ত্রিমুখী সংকটের মুখোমুখি:
১. অর্থনৈতিক বিপর্যয়: দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছে। ২. ব্যক্তিগত স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা: বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ও নারীদের মধ্যে হিজাব বিরোধী আন্দোলন এবং আধুনিক জীবনযাত্রার দাবি শাসনব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৩. উত্তরাধিকার সংকট: আয়াতুল্লাহ খামেনির পরবর্তী নেতৃত্ব কে দেবেন, তা নিয়ে পর্দার আড়ালে চলছে রাজনৈতিক অস্থিরতা।
বর্তমান বিক্ষোভের উত্তাপের মাঝে রাজপথে এবং সামাজিক মাধ্যমে একটি নাম নতুন করে আলোচনায় উঠে আসছে— রেজা পাহলভি। তিনি চ্যুত হওয়া শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির পুত্র। বর্তমানে প্রবাসে থাকা এই যুবরাজকে ঘিরে ইরানের একাংশের মানুষের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, ইসলামি শাসনের বিকল্প হিসেবে পাহলভি বংশের উত্তরাধিকারই হতে পারেন আধুনিক ইরানের রূপকার।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—ইরান কি আবার সেই রাজতন্ত্রে ফিরে যাবে যা ৪৬ বছর আগে জনগণ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল? নাকি রেজা পাহলভি কেবল ইতিহাসের এক দীর্ঘশ্বাস হয়েই থাকবেন?
ইরান আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে চার দশকের প্রতিষ্ঠিত ইসলামি শাসনব্যবস্থা, অন্যদিকে আধুনিকতা ও স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় ফুঁসতে থাকা তরুণ সমাজ। রাজপথের এই আগুন কি কোনো বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে? ইতিহাস কি সত্যিই বৃত্তাকার পথে ঘোরে? রেজা শাহ পাহলভি থেকে শুরু হওয়া আধুনিক ইরানের যাত্রা কি বর্তমানের রেজা পাহলভির হাত ধরে কোনো নতুন দিগন্তে পৌঁছাবে?, নাকি ইরান তার নিজের মতো করে এক নতুন গণতান্ত্রিক পথ খুঁজে নেবে?
শাহ পাহলভি কি ইতিহাসের এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে থাকবেন?
Add a Comment