যাপন
Published : 22 Dec 2025, 05:36 PM
ভাবছেন এ আবার কেমন কথা! বয়স হয়েছে , কদিন পরই ষাটের কোঠায় পা রাখব আর এখন যাবো নাচের ক্লাস করতে! দাদীমা বলে হাসবে না সবাই! হাসুক। তবু আপনি যাবেন। চিকিৎসকরা বলছেন, সুস্থ থাকতে, আনন্দিত থাকতে, প্রাণপ্রাচুর্যে পূর্ণ থাকতে চান, তো যোগ দিন নাচের ক্লাসে। পা টলোমলো! তাল জানেন না! তাতে কি? নিজেকে ছেড়ে দিন, সমর্পণ করুণ নৃত্যের কাছে যেমন করে রুমি সমর্পণ করত নিজেকে ঈশ্বরের কাছে কাছে। তেমনি করে সমর্পিত হোন নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের কাছে। দেখবেন ধীরে ধীরে উদ্বেল হয়ে উঠছেন আপনি! শরীর হালকা হচ্ছে, ছন্দ পাচ্ছে আর আপনি পাচ্ছেন প্রাণ! নাচ আপনাকে সুখী করে তুলবে। প্লেটো বলেছিলেন, সমস্ত শিল্পের মধ্যে নাচই সেই শিল্প যা আত্মাকে প্রভাবিত করে।
শুধু তাই নয়, নতুন এক গবেষণা জানিয়েছে: নাচ কেবল আপনার নিজের নয়, সমগ্র মানব জাতির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি সর্বজনীন ভাষা, শব্দহীন ভাষা- যা ছুঁয়ে যায় প্রাণ-মন। নাচ প্রতিবাদের ভাষা, প্রেমের ভাষা, কামনার ভাষা। এক সমাজের সঙ্গে অন্য সমাজের সংযোগ এনে দেয়। শরীর ও আত্মাকে এক করে।
নাচ ইনটেলেকচুয়াল স্বাস্থ্যকেও উন্নত করে। নৃত্য শরীর ও স্মৃতিশক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। সব বয়স ও সক্ষম মানুষের মধ্যে উৎসবের জন্ম দেয়। এটি যোগাযোগের সবচেয়ে আদিম ভাষা। নাচ হলো জীবন্ত ইতিহাস।
আধুনিক হাইপার রিয়েলিটিতে আমরা সবাই স্ট্রেসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।
নাচ সেই মানসিক চাপ, উদ্বেগ থেকে আপনাকে রক্ষা করবে। ব্যক্তিগত আবেগিক চাপ থেকে রাখবে মুক্ত ।
গবেষণায় দেখা গেছে সামাজিক উৎসবে নাচ মানুষে মানুষে মেলবন্ধন ঘটায়। আন্তরিক করে , কাছে আসার সুযোগ করে দেয়। দু’জন মানুষকে জানার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে। সর্বোপরি জীবন উদযাপনের মাধ্যম নৃত্য।
সেই আদিকাল থেকেই মানুষ চাইত টিকে থাকতে । নিজেকে প্রকাশ করতে। তখন ভাষা ছিলো না। ভাব আদান প্রদানের মাধ্যম হয়ে ওঠে তার শারীরিক ভঙ্গিমা।
নৃত্যের শেকড় মানব সভ্যতার ঠিক কতো আগে প্রোথিত হয়েছে তার দিনক্ষণ বলা যাবে না। কারণ এটি ছিল ছিল তাদের সহজাত প্রকাশভঙ্গির অংশ।
নৃবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, আদিম মানুষেরা আনন্দ, ভয়, যুদ্ধ, বিজয়, বা শোকের মতো মৌলিক আবেগ প্রকাশের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে নড়াচড়া করত। এটি ছিল ভাষার অনুপস্থিতিতে নিজেদের ভাবনার প্রকাশ।
প্রায় ৩০ হাজার থেকে ১০ হাজার বছর আগের গুহাচিত্রে নৃত্যের দৃশ্য পাওয়া গেছে। দৃশ্যগুলো শিকারের প্রস্তুতি, প্রাকৃতিক শক্তির উপাসনা এমনকি রোগ নিরাময়ের মতো আচার অনুষ্ঠান।
হয়তো তারা বিশ্বাস করত শারীরিক ভঙ্গিমার মধ্য দিয়ে তারা আধ্যাত্মিক জগতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারবে!
সভ্যতা এবং কৃষিকাজের সূত্রপাতের সঙ্গে সঙ্গে নৃত্য আরও সংগঠিত রূপ নিতে শুরু করে। প্রাচীন মিশর, সুমেরু সভ্যতায় ধর্মীয় উৎসব, শবযাত্রা, যুদ্ধ জয়, রাজকীয় অভিষেক অনুষ্ঠানে নৃত্যের বিশেষ ভূমিকা ছিল । দেবতাদের খুশি করতে পুরোহিতরা নৃত্য করত।
গ্রিক সভ্যতা থেকে নৃত্য হয়ে উঠেছে শিক্ষার বাহন। থিয়েটারে ট্র্যাজেডি, কমেডি, কোরাস ছিল নৃত্যের ফর্ম।
যেমন প্রাচীন ভারতে ‘ভরত নাট্যম’। ভরত মুনি তার নাট্যশাস্ত্রে নৃত্য ও নাটকের নিয়মকানুন অঙ্গভঙ্গি ও আবেগ নিয়ে আলোচনা করেছেন। যা এখনো নাচের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।
মধ্যযুগে চার্চের উত্থানে নাচ বন্ধ হয়ে গেলেও সাধারণ মানুষ তা টিকিয়ে রেখেছিল সন্তর্পণে।
রেনেসাঁর কালে এসে নাচ পেলো তার ডানা। ছড়িয়ে পড়ল দিকদিগন্তে। ব্যালে নৃত্য হয়ে উঠল আভিজাত্যের প্রতীক।
বিংশ শতাব্দীতে ব্যালে থেকে শুরু করে জ্যাজ, হিপ-হপসহ নানা নৃত্যশৈলী জন্ম নেয়। ল্যাটিন নৃত্যশৈলী সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়।
ট্যাঙ্গো নৃত্যের হিল্লোলে কেঁপে ওঠে বিশ্ব। এই নৃত্য মানুষকে পাগলপ্রায় করে তোলে।
তবে আপনার আমার জন্য এমন নৃত্য না হলেও চলবে। ট্যাঙ্গো পার্টনারই বা কোথায়? আর কোথায় সেই বসন্তসেনা! তবু আশা আছে! যেহেতু ডাক্তার বলছেন, নাচই জীবন। গবেষণা বলছে, নাচ মানব জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাই আর দেরি কেন? টলোমলো শরীরেই মেঝেতে পা রাখুন। যেন অবাক বিস্ময়ে কোনো সুন্দরের দিকে চেয়ে আছেন, করে ফেলুন এমন শারীরিক ভঙ্গিমা! বেঁচে উঠুন।
Add a Comment