প্যারেন্টিং
Published : 23 Dec 2025, 07:51 PM
সুমনার বাবা বাড়ি ফিরেই হাক ছাড়েন, সুমনা বই নিয়ে আয়। দেখি সারাদিন কী পড়েছিস? তারপর এক এক করে পড়া ধরতে থাকেন। সুমনা ঠিকঠাক মতো পড়া করে রাখে। তারপরও উত্তর দিতে দেরি হলে বাবার ধমকে কাঁপতে থাকে। আপাত দৃষ্টিতে সুমনার বাবাকে আপনাদেও সবার কাছেই হিরো মনে হবে। যে বাবা সারাদিন অফিস থেকে এসেই ছেলেমেয়েদের পড়ার খোজ করে।
কিন্তু সুমনার কাছে তা মনে হয় না। সে চায় বাবা বাইরে থেকে এসে ওকে কাছে ডেকে আদর করবে , সারাদিন কি কি করেছে সেই সব গল্প শুনতে চাইবে। ও যে ছবিটি একেছে তা দেখতে চাইবে। বা গানের টিচার যে নতুন গানটি শিখিয়েছে তার দুটো কলি শুনতে চাইবে। কিংবা বাবা আসার আগে হাতমুখ ধুয়ে চুলে দুটো বেণী করেছে, সেই বেণীর নীল ফিতে দেখে বলবে, বাহ্ সুমনা, তোমাকে তো খুব সুন্দর দেখাচ্ছে! কে করে দিয়ে দিয়েছে? মা? ডাকো তো তোমার মাকে। আজ তোমার আর তোমার মায়ের জন্য একটি সারপ্রাইজ আছে।
এই হলো আপনার সন্তান। সে কি চায়। সে তো অবশ্যই চায় আপনাকে গর্বিত করতে। কিন্তু আপনি কি চাচ্ছেন? রাতদিন পরিশ্রম করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে থাকতে নিজে মেশিন হয়েছেন আর সন্তানকেও তাই বানাতে চান? নাকি আপনার অপূর্ণ ইচ্ছেগুলি তার মধ্য দিয়ে পূরণ করতে চান?
ইদানিং কোরিয়ান মুভিগুলো দেখলে বোঝা যায়, প্রতিযোগতিার দৌড়ে কেমন করে মা-বাবা তার সন্তানদের ফেলে দিচ্ছেন। খারাপ ফল করলে, হোক তা লেখাপড়ায়, হোক তা গানে, হোক তা নাচে, হোক তা খেলাধুলায়- খারাপ করেছে তো সেই সন্তানের জীবনটাই হেল। সারাজীবনের জন্য তাকে ট্রমায় ফেলে দেয়া।
তাদের বিকাশের জন্য আপনি নিজে চাপে থাকছেন, তাদেরকেও ফেলছেন দীর্ঘমেয়াদি ট্রমায়। অথবা আপনার কাছে মনে হচ্ছে এভাবেই বাচ্চাদের বড় করতে হয়।
অথচ এই প্রতিযোগিতায় পড়ে স্ট্রেস তৈরি হচ্ছে। যা আপনাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতি করছে। আবার আপনার সন্তানেরও মনে হয়, আমি মা বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পারছি না। ও ভালো করছে, আমি ভালো নই। আস্তে আস্তে তার আনন্দ ও স্বাভাবিক কৌতুহল নষ্ট হয়। যে শিশু বার বার বলতে কেন? সে আপনার গলা শুনলেই ভয় পায়।
সন্তান নিয়ে এই প্রতিযোগিতা মাবার সম্পর্কেও অবনতি ঘটায়। ' তোমার ছেলে পারে না। তোমার মেয়ে পারল না কেন? তুমি কি করো আরো সময় দিতে পারো না? টিচার কি পড়ায় তার খোজ রাখো?'
কর্মজীবী মা হলে তো কথাই নাই। চাপ! চাপ! আর চাপ! বাইরের চাপ, ঘরের চাপ। স্বামীর চাপ, সব মিলিয়ে সন্তান প্রতিপালন করাই একটা চাপে পরিণত হয়।
আমরা ভুলেই যাই, সন্তান পৃথিবীতে তার মা-বাবার মাধ্যমে আসে বটে, তবে সে একসময় স্বতন্ত্র মানুষ হবে।
নিজের প্রত্যাশাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখুন।
আমরা কেউ পারফেক্ট নই। পারফেক্টনেস প্রকৃতি পছন্দ করে না। সে প্রতিনিয়ত ভাঙে। নতুন করে তৈরি করে। তাই নির্দিষ্ট ছকে ফেরা মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসুন আগে।
ওর বাচ্চা এমন হয়েছে বলে আপনার বাচ্চাও এমন হবে তা কিন্তু নয়। আপনার পরিবেশ, প্রতিবেশ, অর্থনৈতিক অবস্থা, কেয়ারিং এগুলোও মনে রাখতে হবে। অযথা সন্তানের ওপর কিছু চাপিয়ে দেবেন না।
আপনি নিজে যা হতে পারেননি তা তাকে হওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করবেন না। হয়তো তার মধ্যে এমন কিছু গুণ রয়েছে যা আপনার নজর এড়িয়ে যাচ্ছে। বরং ওই বিষয়টির ওপর ফোকাস করলে আপনার সন্তান আরো গ্লোরিয়াস হতো। আর আপনিও পারফেক্ট প্যারেন্টের ধারণা থকে সরে আসতে পারতেন ।
আর আপনার সন্তানকে একজন আদর্শ রোবট হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে দেখুন, যে ভুল করবে। ভুল করে করে শিখবে। তাকে থামিয়ে দেবেন না।
সোশ্যাল মিডিয়ার হাইলাইট রিল দেখে তাকে বাস্তব জীবন মনে করবেন না।
অনেক সময় মা বাবারা অন্যদের সাফল্যেও গল্প দেখে নিজেদেও ব্যর্থ মনে করতে থাকে। সামাজিক তুলনা এড়িয়ে চলুন সজ্ঞানে।
অন্যের সন্তানের মাইলস্টোনের সাথে নিজের সন্তানের তুলনা বন্ধ করুন এখনই। প্রতিটি শিশুর বিকাশের গতি ভিন্ন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের প্রতি যত্নশীল হোন। সেলফকেয়ার মা-বাবার জন্য জরুরি।
আপনি শান্ত ও খুশি থাকলে তবেই আপনার সন্তান খুশি থাকবে।
সন্তানের সঙ্গে বন্ধন আরো মজবুত করতে হবে। আপনি হয়তো অনেকক্ষণ সময়ই সন্তানের থাকছেন। সন্তানকে খাওয়াচ্ছেন। বাইরে থেকে আসার সময় চকলেট, চিপস কিনে আনছেন। দামি দামি খেলনা দিচ্ছেন। কিন্তু একদিনও সময় করে সেই খেলনা দিয়ে সন্তানের সঙ্গে খেলেন নি। ঘুম থেকে উঠে অন্তত দশ মিনিট মোবাইল এবং টিভি ছাড়া কেবল সন্তানের সঙ্গে থাকুন । তাদেও কথা শুনুন। তার ছোট ছোট অর্জন গুলোকে সেলিব্রেট করুন।
মনে রাখবেন প্রকতি আপনাকে নির্বাচন করেছে একটি মানব শিশুকে ভবিষ্যতের মানুষ তৈরি করার জন্য। তাদেও জন্য প্রয়োজন নিরাপদ , ভালোবাসাপূণ, চাপমুক্ত পরিবেশ দেয়া। ঠিক যেমন দিতে হয় একটি চারাগাছকে। এখন আপনই ঠিক করুন শিশুটিকে আপনি কী বানাবেন, নিজের অপূর্ণতার পূরণ করার মেশিন নাকি মানবিক মানুষ!
Add a Comment