মুভি
Published : 16 Jan 2026, 03:17 PM
চলচ্চিত্র সম্পর্কে কোনো ধারণা জন্মানোর আগেই, সেই শৈশব থেকে জয়শ্রী কবিরের সঙ্গে আমার পরিচয়। আমাদের মায়েরা তখন দল বেঁধে সিনেমা হলে যেতেন, আমাদেরও সঙ্গে নিতেন। আমার শৈশবের শহর টাঙ্গাইলে জয়শ্রীর ‘সীমানা পেরিয়ে’ চলেছিল মাত্র তিনদিন, কেবল মর্নিং শো-তে। মনে আছে, সারা শহরজুড়ে মাইকিং করা হয়েছিল— ‘সীমানা পেরিয়ে: শুধুমাত্র বুদ্ধিজীবীদের জন্য’। দর্শক ছিলেন মূলত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া তরুণ-তরুণী আর শিক্ষকরা। তাঁদের ভিড়েই ছোট্ট আমি প্রথমবার জয়শ্রীকে দেখার সুযোগ পাই।
আংশিক রঙিন সেই ছবির একটি দৃশ্য আমার শিশুমনে গভীর দাগ কেটেছিল। নির্জন সৈকতে জয়শ্রী একা পড়ে আছেন—দৃশ্যটি দেখে আমি হলের মাঝেই কেঁদে ফেলেছিলাম। আম্মাকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "আম্মা, জয়শ্রীর মা কোথায়?" সেই ‘অলৌকিক’ নারীর সঙ্গে দীর্ঘ সময় পর ২০১৩ সালে আমার কথা বলার সুযোগ হয়েছিল; তিনি তখন ইংল্যান্ডে।
সত্তরের দশকে ‘সীমানা পেরিয়ে’ কেবল একটি সিনেমা ছিল না, এটি ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের আধুনিকতা ও মননশীলতার এক অনন্য মাইলফলক। আলমগীর কবিরের ‘সূর্যকন্যা’ ও ‘সীমানা পেরিয়ে’ জয়শ্রীকে কেবল একজন নায়িকা হিসেবে নয়, একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে চিনিয়েছিল। এছাড়া ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ও ‘রূপালী সৈকত’ ছবিগুলোও তাঁকে আমাদের চলচ্চিত্রে বিশেষ স্থান দিয়েছে।
প্রথাবিরোধী পরিচালক আলমগীর কবিরের সৃষ্টিগুলো কেবল সেলুলয়েডের গল্প নয়; সেগুলো ছিল শ্রেণিবিভাজন ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের দলিল। তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে অগ্রগামী একজন মানুষ। তাঁর ‘সূর্যকন্যা’ এবং ‘সীমানা পেরিয়ে’ মূলত একটি ‘ইউটোপিয়া’ বা নতুন সমাজের আকাঙ্ক্ষা। আর জয়শ্রী ছিলেন এই দুই সিনেমার প্রাণ।
জয়শ্রীকে ঘিরে যেমন মুগ্ধতা ছিল, তেমনি ছিল অনেক রহস্য আর মিথ। বিশেষ করে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন এবং হঠাৎ আড়ালে চলে যাওয়া নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ ছিল না। তবে খুব কম মানুষই জানতেন, ইংল্যান্ডের জীবনে তিনি ছিলেন ভীষণ নিভৃতচারী। হুল্লোড় তাঁর পছন্দ ছিল না। নির্জনতার খোঁজে মাঝে মাঝে তিনি চলে যেতেন নিজের একটি দ্বীপে। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অত্যন্ত ধীর ও স্থিত—যেন কথা বললে প্রজাপতির পাখা ভেঙে যাওয়ার ভয়! নির্জন দ্বীপে সময় কাটানোটা হয়তো কেবল আভিজাত্য ছিল না, বরং কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে নিজের ভেতর ডুব দেওয়ার বাসনা ছিল। যেন তাঁর সিনেমার সেই জনমানবহীন দ্বীপটিই বাস্তবে ধরা দিয়েছিল।
১২ জানুয়ারি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আকাশ থেকে এই উজ্জ্বল নক্ষত্রটি খসে পড়ল। তাঁর দীর্ঘ জীবনযাত্রা এক রহস্যময় চলচ্চিত্রের মতোই সমাপ্ত হলো। কিছু মানুষ কেবল যান্ত্রিকতার পেছনে ছোটে না, তাঁরা নিজের ভেতর এক ঈশ্বরীয় প্রশান্তি নিয়ে বেঁচে থাকতে জানেন। জয়শ্রী ছিলেন সেই দলের। তাঁর ঠোঁট মেলানো সেই বিমূর্ত গানগুলো সারাজীবন মৌনতার সুতোয় বোনা স্মৃতি হয়ে থাকবে।
২০১৩ সালে যখন তাঁর সঙ্গে কথা হয়, সেটি ছিল আমার জন্য এক অলৌকিক ঘটনা। আমি তাঁকে শৈশবের সেই মুগ্ধতার গল্প শোনালাম। তিনি অবাক হয়ে বললেন, "আমার ওইসব অভিনয় তুমি আজও মনে রেখেছ! আমি তো ভাবি, আমি কখনো আমার সেরাটা দিতেই পারিনি।"
আসলেই কি?
Add a Comment