মুভি
Published : 16 Jan 2026, 03:22 PM
সত্তর ও আশির দশকের উত্তাল সময়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে যে কজন নির্মাতা সুস্থ ধারা ও চিন্তাশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষতম আলমগীর কবির। তাঁর চলচ্চিত্র মানেই ছিল প্রচলিত সমাজকাঠামোর ব্যবচ্ছেদ। এর মধ্যে ‘সূর্যকন্যা’ এবং ‘সীমানা পেরিয়ে’ চলচ্চিত্র দুটি আজও প্রাসঙ্গিক—বিশেষ করে বৈষম্যহীন সমাজ এবং নারীর মানবিক মুক্তির লড়াইয়ের ক্ষেত্রে। সূর্যকন্যা: পুরুষতন্ত্রের শৃঙ্খল ভাঙার ফ্যান্টাসি ১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সূর্যকন্যা’ চলচ্চিত্রটি ছিল সেই সময়ের জন্য এক অসম সাহসী নির্মাণ। এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একজন শিল্পী লেনিন (বুলবুল আহমেদ), যার অবচেতন মন সাম্যবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ। সে স্বপ্নে দেখে এমন এক পৃথিবীর, যেখানে খাদ্য, বস্ত্র ও শিক্ষার কোনো বৈষম্য থাকবে না। সিনেমাটিতে একটি নারী মূর্তির মাধ্যমে পরিচালক ‘লাবণ্য’ (রাজশ্রী বোস) চরিত্রটি সৃষ্টি করেন। লাবণ্যের সংলাপে উঠে আসে নারীর হাজার বছরের বন্দিত্বের ইতিহাস। সে নিজেকে ‘সূর্যকন্যা’ দাবি করে বলে যে, পুরুষতন্ত্র তাদের কেবল ভোগের সামগ্রী ও সন্তান উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত করেছে। লাবণ্যের এই আকুতি আসলে একটি বৈষম্যমুক্ত সমাজেরই প্রতিফলন, যেখানে নারী তার শ্রম ও সৃজনশীলতা নিয়ে পুরুষের সমান মর্যাদা পাবে। অন্যদিকে ‘মনিকা’ (জয়শ্রী কবির) চরিত্রটির মাধ্যমে আলমগীর কবির এমন এক বলিষ্ঠ ও স্বনির্ভর নারীর রূপ দেখিয়েছেন, যে অপমানের মুখে মাথা নত না করে নিজের অবলম্বন নিজেই হতে চায়। সীমানা পেরিয়ে: শ্রেণীহীন প্রেমের এক মানবিক দলিল ১৯৭৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সীমানা পেরিয়ে’ চলচ্চিত্রের পটভূমি আরও ভিন্ন ও গভীর। ১৯টা সমুদ্র উপকূলে এক প্রলয়ংকরী জলোচ্ছ্বাসের পর এক অভিজাত পরিবারের শিক্ষিত তরুণী এবং এক অন্ত্যজ শ্রেণীর মাঝির জনমানবহীন এক দ্বীপে বেঁচে থাকার লড়াই নিয়ে এর গল্প। এখানে ‘সীমানা’ বলতে কেবল ভৌগোলিক সীমানা নয়, বরং শ্রেণী ও আভিজাত্যের যে কৃত্রিম দেয়াল মানুষ তৈরি করে রেখেছে, তাকেই বোঝানো হয়েছে। সেই নির্জন দ্বীপে সামাজিক পদমর্যাদা বা আভিজাত্যের কোনো মূল্য থাকে না। সেখানে বেঁচে থাকার জন্য উচ্চবিত্ত তরুণীকেও নির্ভর করতে হয় শ্রমজীবী মানুষের ওপর। পরিচালক অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথে দেখিয়েছেন যে, সভ্যতার কৃত্রিম আবরণ খসে পড়লে মানুষে মানুষে কোনো বিভেদ থাকে না। প্রেম ও মানবিকতাই হয়ে ওঠে প্রধান সত্য। ভূপেন হাজারিকার কালজয়ী সুর এবং বুলবুল আহমেদ ও জয়শ্রী কবিরের অনবদ্য অভিনয় সিনেমাটিকে একটি ধ্রুপদী রূপ দিয়েছে। শ্রেণীহীন ও বৈষম্যমুক্ত সমাজের প্রতীক এই দুটি চলচ্চিত্রকে কেন সাম্যের প্রতীক বলা হয়? কারণ আলমগীর কবির কেবল গল্প বলেননি, তিনি দেখিয়েছেন: ১. শ্রমের মূল্য: ‘সীমানা পেরিয়ে’-তে শ্রমজীবী মানুষের সামর্থ্য ও মানবিকতাকে আভিজাত্যের উপরে স্থান দেওয়া হয়েছে। ২. নারীর স্বকীয়তা: ‘সূর্যকন্যা’-তে নারীকে ঘরবন্দি দশা থেকে বের করে ভোরের আলো দেখার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। ৩. সামাজিক সংস্কারের বিলোপ: দুটি সিনেমাতেই দেখানো হয়েছে যে, অর্থ ও বংশের গৌরব নয়, বরং মানুষের মুক্তি নিহিত রয়েছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বৈষম্যহীনতায়। উপসংহার সম্প্রতি জয়শ্রী কবিরের প্রয়াণে তাঁর অভিনীত এই মাস্টারপিসগুলো আবারও আলোচনায় এসেছে। আলমগীর কবির তাঁর এই কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করে গেছেন যে, চলচ্চিত্র কেবল বিনোদন নয়, এটি সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার। ‘সূর্যকন্যা’ ও ‘সীমানা পেরিয়ে’ আজও আমাদের এক বৈষম্যমুক্ত ও সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে শেখায়।
Add a Comment