গল্প
Published : 20 Dec 2025, 05:15 PM
'যেখানে আছিস সেখানেই থাক, একদম ভেতরে ঢুকবি না। এক পা বাড়িয়েছিস কি মেরে তোর ঠ্যাং আমি ভেঙে দেবো।' লক্ষ্মীর তীক্ষ্ন কণ্ঠস্বর বাতাসের ধাক্কায় প্রলম্বিত হতে হতে তার মস্তিষ্কে ধাক্কা খায়। শীতের সকালের আলস্যজড়িত তন্দ্রা ছুটে যায় তার। বেশ কিছুক্ষণ আগে তার ঘুম ভাঙলেও সে শুয়েছিল কম্বলের ওমের ভেতর। একে তো শীত, তার ওপর তীব্র বাতাস, বৃষ্টির ছাঁটও আছে। এরকম সকালে একটু শুয়ে থাকা রঘুবনের প্রাপ্য হতেই পারে। কিন্তু না সহধর্মিণী লক্ষ্মীদেবীর উচ্চকিত কণ্ঠস্বরের জ্বালায় সে সুখ তার কপালে জুটল না। তাকে উঠতেই হলো, নিতান্ত অনিচ্ছায়। রঘুবন ওঠে। নির্বিকারভাবে বেসিনে হাতমুখ ধোয়, বাথরুমে গিয়ে প্রাতঃক্রিয়া শেষ করে। তারপর ধীরে নিরাসক্ত ভঙ্গিতে পা ফেলে চেয়ারের দিকে এগুতে থাকে।
'এই যে আপনি, কী করবেন এখন? সাতটা তো বেজে গেছে, আমি উঠান ঝাড়ু দিয়ে ফেলেছি, বেদিও ধুয়ে দিয়েছি। এখন আর তোমার কম্ম কী? এখন তো তোমার টিফিন পিরিয়ড। কফি খাওয়ার সময় হয়েছে। আর উনি ঠিক ঠিক মতো এসেছেন। যা ভাগ্। তোর আর কাজ করতে হবে না।'
জগাদা বাইরে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। একরত্তি মেয়ে! বড়োজোর বছর দশেক বয়স হবে। লক্ষ্মীকে সে ঘরের কাজে সাহায্য করে। তুমি এমন চিৎকার করছ কেন?
রঘুবন একটু রাগত স্বরে লক্ষ্মীকে প্রশ্ন করে। তার আরো কিছু বলার ছিলো। কিন্তু লক্ষ্মী তাকে মাঝপথে থামিয়ে দেয়। ভগবানের দোহাই, তুমি এখানে নাক গলাবে না। তোমার আস্কারা পেয়ে পেয়ে ওই ছেড়ি মাথায় উঠেছে। এখন তো উনি জমিদার হয়ে গেছেন। সপ্তাহে চার দিন আমিই সকালের কাজ করি। সব শেষ হলে উনি দর্শন দেন। তোমার কী? তুমি তো কফি পেলেই খুশি। যাও তোমার কফি রেডি। সে তোমার জন্য টেবিলে অপেক্ষা করছে।
রঘুবন টেবিলের ধার ঘেঁষে চেয়ারে বসে পড়ে এবং কফি পান করতে থাকে।
হ্যাঁ , হ্যাঁ কফি খাও, তারপর পেপার পড়ো, তারপর বসে বসে টেলিভিশনের ফালতু খবর দেখ। সব দোষ আমার কপালের। ঘরের এইসব ঝক্কি সামলে যাও স্কুলের ওই ক্ষুদে বিচ্ছুগুলোকে সামলাও।
লক্ষ্মীর নিজের ওপর এতোটাই রাগ হতে থাকে যে, তার মনে হলো সে এখনই কেঁদে ফেলবে। সে নিজেকে সংযত করে। আহা বেচারা, লক্ষ্মী! তুমি তাকে দোষ দিতে পারো না। ওই নারীটির আর কী দোষ। কতো কঠিন তার জীবন। সাড়ে সাতটার মধ্যে তাকে বের হতে হয়। না হলে বাস মিস হবে। ঠিক সময়মতো স্কুলে পৌঁছাতে পারবে না।
জগদা বেশিরভাগ সময় লক্ষ্নীর এইসব তিরষ্কার গায়ে মাখে না। লক্ষ্মী তার ঝাল ঝেড়ে শান্ত হলে, জগাদা নীরবে ঝাড়ুটি হাতে নেয় এবং বাড়ি-ঘর ঝাঁট দিতে থাকে। কিছুক্ষণ পর লক্ষ্মীর মেজাজ ঠা-া হলে সে জগদার জন্য কফি আনে। ছোট্ট মেয়েটির অহমে লাগে। পেয়ালা ছুঁয়েও দেখে না। লক্ষ্মী আবার তাকে বকা দেয়, ওহ! আপনার তো আবার আত্মসম্মানে লাগছে, শয়তান কোথাকার! বহুৎ হয়েছে তোমার ওইসব রংঢং! কফি খাও।
জগাদা নম্্রভাবে তাই করে।
কোনো কোনো দিন লক্ষ্মী তার সামনে কফির পেয়ালা ঠেলে দেয়। জগাদা সেটি ধরলে, লক্ষ্মী সার্কাসের ভঙ্গিতে বলে, তমি কাজের জন্য লেট হও, কিন্তু কফির বেলায় খুবই স্মার্ট। নির্লজ্জ কোথাকার!
এসব বকাবকিতে জগদা কেমন ঘোরের মধ্যে পড়ে যায়। তবু সে কফি পান করতে থাকে। জগদা, সুন্দরীর চেয়ে দুই বছরের ছোট। রঘুবনের মেয়ে সুন্দরী এখনও কম্বলের নিচে আরাম করে ঘুমিয়ে আছে। যাই হোক আজ লক্ষ্মী খুবই রেগে আছে। জগদা ঝাড়ু ধরলেই সে চিৎকার করে ওঠে।
না না, তুমি ঝাড়ু ধরবে না। তোমার কোনো কাজ করার দরকার নেই। তুমি যাও।
জগদার কচি মুখখানায় দুঃখ এবং দুশ্চিন্তার রেখা ফুটে ওঠে।
তার চোখ জলপূর্ণ হয়ে চোখের পাতা ভিজিয়ে দেয়। সে আসলেই বেশিদূর এগুতে পারে না। করুণ চোখে রঘুবনের দিকে তাকায়। লক্ষ্নী! রঘুবন বিষয়টি জোড়া দিতে চেষ্টা করে।
প্লিজ, তার সাইড নেবে না একেবারে। আমি আর তাকে রাখছি না। তাকে যেতে হবে। তার কণ্ঠস্বরে চরম সিদ্ধান্ত প্রকাশ পায়।
আহারে গরিব অসহায় মেয়েটি...
না না, আমি তার সম্পর্কে একটা কথাও শুনতে চাইনে।
তোমার দেরি হলো কেন, জগাদা? রঘুবন জিজ্ঞেস করে।
জগাদা উত্তর দেয় না।
উত্তর দেয় লক্ষ্নী।
আসবেন কেমন করে! উনি তো গতরাতে নাইট শোতে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন।
তুমি নাইট শোতে গিয়েছিলে? রঘুবনের প্রশ্নে সে মাথা নাড়ে।
শুধু এই সপ্তাহেই সে তিনবার গিয়েছে।
রঘুবন অবাক হয়।
নাইট শো দেখার টাকা তোমাকে কে দেয়?
আমার নানীম্মা।
তোমার নানীম্মাকে নিয়ে আসো। এ বিষয়ে তার সঙ্গেই কথা বলবো।
লক্ষ্মী জানিয়ে দেয়।
জগদা আবার রঘুবনের দিকে তাকায়। তার চোখের জল চুরের মধ্যে পড়ে চিক চিক করছে। বেচারা! এই বৃষ্টির মধ্যে দৌঁড়ে চলে গেল।
সে খুবই বুদ্ধিমতী, পরিশ্রমী এবং ঘরের সব কাজ করতে পারে। সপ্তাহের টিভি ফিল্ম শো দেখার জন্য একটুও দেরি হয় না তার। টিভিতে যে নাচের অনুষ্ঠান হয়, তাও তার খুব প্রিয়। সে সিনেমার সব নায়ক-নায়িকার নাম জানে। এমনকি সব ছোটখাট চরিত্রে যারা অভিনয় করে তাদের নামও তার মুখস্থ। যদি কেউ তাদেরকে চিনতে ভুল করে সঙ্গে সঙ্গে সে তাদের নাম বলে দেয়।
রঘুবন এখন বুঝতে পারছে জগাদা কীভাবে এতো জ্ঞান অর্জন করেছে। সে খুবই আহত হয়, এইটুকু একটা মেয়েকে সিনেমা দেখতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে! এমন নিয়মিতভাবে! সে এই মেয়েটির সহ্য ক্ষমতা দেখে আসলেই অবাক হয়। আহা! যদি সে স্কুলে যেতে পারত! কিন্তু কিভাবে? সে কীভাবে স্কুলে যাবে?
শিশু বয়সেই সে তার বাবাথ মাকে হারায়। তার বড় ভাই এবং সে লালিত পালিত হয় তার নানীর কাছে। তার নানী খুবই কষ্টকর জীবন যাপন করে। দুপুরে সে কফি শ্রমিকদের কাছে খাবার সরবরাহ করে। থাকে ব্যাংকের যে লেকটা আছে তার পাশে বস্তিতে।
জগদার ভাই বড়ো হয়েছে, এখন রিক্সা চালায়। বৃদ্ধাটি এই ছোটো মেয়েকে লক্ষ্মীর কাছে নিয়ে আসে তাকে কাজে রাখবার জন্য।
জগদা এবং লক্ষ্মী গত দুই মাস ধরে ভালই ছিলো। সে সময় জগদা দেরি করে কাজে এলে লক্ষ্মী বিরক্ত হতো, তাকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখাত। কিন্তু জগদার উপস্থিতির রেকর্ড আর ভালো হয় না।
নাইট শো দেখে একটা শিশু কীভাবে সকালে কাজ করতে আসবে?
সোমবার তার ভাই তাকে টাকা দেয় নাইট শোতে যাবার জন্য, বুধবার তার ভাকি টাকা দেয়। আর নানী দেয় শুক্রবারে।
এই রকম নিয়মিত নাইট শোর কারণে তার চোখে অবসাদ জমে গেছে। তাকে ইঁচরে পাকাও বানিয়েছে। যখনই টিভি সিরিয়ালে কোনো অন্তরঙ্গ দৃশ্য আসে সে সুন্দরীর দিকে তাকিয়ে অর্থপূর্ণ হাসে।
জগদা সন্ধ্যায় তার নানীকে নিয়ে আসে। লক্ষ্মী বৃদ্ধাকে বলে, দেখ পেচি আম্মা আমি সূর্য ওঠার আগেই আমার উঠান পরিষ্কার চাই। আর বেদিতে জল ঢালতে হবে তাও সূর্য ওঠার আগেই। এই কাজের জন্যই তোমার নাতনিকে রাখা হয়েছে। যদি তাই না হয় তবে কেন আমি বসিয়ে বসিয়ে তাকে বেতন দেবো?
আপনি যদি না রাখেন তো এই গরিব মেয়েটি কই যাবে? এতো আপনার মেয়ের সমানই আম্মা।
সে কই যাবে, না যাবে, তাতে আমার কি?
ছোট্ট বাচ্চা মাঝে মাঝে সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারে না।
কীভাবে সে উঠতে পারবে? যদি সপ্তাহের সাতদিনের মধ্যে তিনরাতই সে নাইট শোতে যায়। লক্ষ্মী তার সিদ্ধান্তে অনড়।
রঘুবন বৃদ্ধাকে বলে, আম্মা এটা কি একটা বয়স নাইট শো দেখতে যাওয়ার? তাও এরকম প্রতি সপ্তাহে তিনবার।
বৃদ্ধা কিছু না বলে মাথা নত করে থাকে।
অবশ্যই শিশুরা ছবি দেখতে ভালোবাসে, কিন্তু বড়োদেরও তো দায়িত্ব আছে। তোমার উচিত তাকে কন্ট্রোল করা। তা না উল্টো তুমি তাকে টাকা দাও এবং তাকে গোল্লায় যাওয়ার সব রাস্তা পরিষ্কার করে ফেলেছ।
বৃদ্ধা সামনের দিকে তাকায়। তার ঠোঁটজোড়া কম্পমান। যেন কিছু বলতে যেয়েও বার বার আটকে যাচ্ছে। কিন্তু সে নীরব থাকে।
রঘুবন বেশ রাগত স্বরেই বলে, একদিন তোমার নাতি তাকে টাকা দেয়, একদিন দেয় নাতবৌ, একদিন তুমি নিজেই দেও। কেন এই শিশুটির জীবন নষ্ট করে দিচ্ছ?
এসময় বৃদ্ধাটি কেঁদে ওঠে।
পেচি আম্মা, কান্না করে কোনো লাভ নাই। আমার ডিসিশন ফাইনাল। জগদাকে আমি আর রাখবো না। তার বকেয়া যা আছে নিয়ে যাও এবং বিদায় হও। লক্ষ্মী দৃঢ়ভাবে বলে।
আমি কী করবো আম্মা? বৃদ্ধা কাঁদতে কাঁদতে বলে। দুই মাস আগে আমার নাতিটার বিয়ে দিয়েছি। আমার ঘর একটাই। যেখানে আমরা রান্না করি, খাই, ঘুমাই। যখন থেকে সে বিয়ে করেছে তখন থেকে আমি আর আমার নাতনিটি বাইরে খোলা জায়গায় ঘুমাই। রাতে বৃষ্টি নামলে আমাদের ঘুমানোর কোনো জায়গা থাকে না। আমি সারা রাত দেয়ালে ঠেস দিয়ে কাটিয়ে দেই। কিন্তু ওই ছোট্ট মেয়েটিকে আমি কী করবো?... তাই তাকে আমি পাড়ার মেয়েদের সাথে নাইট শোতে পাঠিয়ে দেই। ...'
লক্ষ্মী এবং রঘুবন বাকরুদ্ধ হয়ে যায়।
সেরাতে লক্ষ্মী তার স্বামীর বুকে মুখ লুকিয়ে কেঁদে ভাসিয়ে দেয়। বিড় বিড় করে বলে... জগাদা জগদা...
রঘুবন তাকে সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করে। কাঁদছ কেন জগদা তো এখন তোমার কাছেই কাজ করে। এর চেয়ে বেশি আমরা আর কি করতে পারি?
অতঃপর জগদা বড়ো হয়। একদিন সে এক রিক্সাওয়ালাকে বিয়ে করে এবং সে তার ছোটো ননদকে নাইট শোতে যাওয়ার জন্য টাকা দেয়।
[তামিল গল্প জগাদা'র ইংরেজি থেকে অনূদিত]
Add a Comment