লিটমুড
Published : 19 Jan 2026, 08:33 AM
( পৃথিবীতে নারী নিয়ে যতো আলোচনা হয়েছে ততো আর কোনো বিষয় নিয়ে হয়েছে কিনা সন্দেহ আছে। আর নারী বিষয়ক আলোচনার কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে নারীবাদ। সুলেখক আহসান হাবিব লিখেছেন নারীবাদ নিয়ে বংশাইটাইমসে । চার পর্বের ধারাবাহিক এই লেখা পড়তে সঙ্গে থাকুন...)
১
মানব জাতির সব ধর্মে, রাষ্ট্রর নির্মিত আইনে, সামাজিক সমস্ত প্রথায় এটাই বলা হয়েছে যে নারী সৃষ্টি করা হয়েছে পুরুষের জন্য।
পুরুষের জন্য মানে?
মানে পুরুষের যাবতীয় সেবায় নিয়োজিত থাকায় নারীর একমাত্র কাজ।
যৌনতা থেকে রান্না, সন্তান জন্ম দেয়া, লালনপালন করা, উত্তরাধিকার তৈরী করা, সম্পত্তি রক্ষা ইত্যাদি। সব করবে নারী কিন্তু এসবের মালিক থাকবে #পুরুষ।
নারীবাদ মানে পুরুষের তৈরী এইসব মিথ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া।
২
পুরুষ নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা দিয়ে নারীর উপর যে আধিপত্যবাদ চাপিয়ে দিয়েছে, সেটার নাম 'পুরুষতন্ত্র'। এই পুরুষতন্ত্রই নারী এবং পুরুষের অবস্থানকে বদলে দিয়েছে। নারী হয়ে পড়েছে অধস্তন।
নারীবাদ এই পুরুষতন্ত্রের বিরোধী, কোন পুরুষের নয়। তাই নারীবাদ লড়াই করে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে।
নারীবাদের কাজ পুরুষতন্ত্রকে গুঁড়িয়ে দেয়া।
৩
প্রচলিত একটি ধারণা যে পুরুষ নারীর চেয়ে বুদ্ধিমান, কারণ পুরুষের মস্তিষ্ক নারীর মস্তিস্কের চেয়ে কিছুটা ওজনে বেশি। পুরুষতন্ত্র এই ধারণাকে খুব পছন্দ করে। কিন্তু বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে মস্তিস্কের ওজনের পার্থক্য কখনোই বুদ্ধির তারতম্যের কারণ নয়। মস্তিস্কের ওজন কম বা বেশি হওয়ার সংগে শারীরিক গড়ন ও উচ্চতার সম্পর্ক রয়েছে। হাতির মস্তিষ্ক মানুষের মস্তিস্কের চেয়ে বহুগুণ বেশি, কিন্তু কোন গাধা বলবে হাতি মানুষের চেয়ে বুদ্ধিমান!
বুদ্ধির পার্থক্য গড়ে দেয় সুষম বিকাশ ও অধিকার উপভোগের প্রতিবন্ধকতা। পুরুষতন্ত্র এটাই করে। ভার্জিনিয়া উল্ফ বলেছিলেন 'পাখির ডানা বেঁধে রেখে তার উড়তে না পারার অক্ষমতা একটি হাস্যকর বিষয়'।
নারী পুরুষ সমান বুদ্ধিগুণসম্পন্ন, বাধাবন্ধনহীন বিকাশের পরিবেশ বজায় থাকলেই তার প্রমাণ মিলবে। যেখানে এই পরিবেশ তুলনামূলক বেশি, নারী সেখানে তত অগ্রগামী।
নারীবাদের কাজ এইসব মিথ্যা প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে সরব হওয়া।
৪
আমরা যখন বাজার থেকে একটি পণ্য কিনি, আমরা বিনিময় মূল্য দিই।
কিসের বিনিময়?
একটি পণ্যের মধ্যে ধারিত থাকে শ্রমিকদের বিমূর্ত শ্রম। পণ্যটি বানাতে একটা নির্দিষ্ট শ্রম-সময় লাগে, এটাকে বলা হয় সামাজিকভাবে আবশ্যকীয় শ্রম-সময়। এখানে লেখা থাকে না শ্রমিকের লিংগ- নারী কিংবা পুরুষ- বরং পণ্যটি তৈরি হওয়ার সংগে সংগেই এর মূল্য নির্ধারিত হয়ে পড়ে।
কিন্তু পুঁজিপতি শ্রমিকের মজুরি দেয়ার সময় লিংগ ভেদ করে, নারী শ্রমিকদের মজুরি পুরুষ শ্রমিকদের চেয়ে কম দেয়। অথচ উভয়েই একই শ্রম-সময় দিয়ে তৈরি করেছে পণ্যটি। পুঁজিপতি যে আধিপত্যের বশে এই অসম মজুরি দেয়, তার প্রধান কারণ- পুরুষতন্ত্র। নারী শ্রমিকদের এই কম মজুরি দিয়ে সে তাদের শ্রম-সময় আত্মসাৎ করে, বেশি মুনাফা পকেটে ঢুকায়।
নারীবাদের কাজ লিংগভিত্তিক মজুরি প্রদানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো
৫
আমরা যদি সমাজ বিকাশের বিভিন্ন স্তরগুলি দেখি, দেখবো উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রমের বৈশিষ্ট্য পুরুষ এবং নারীর অবস্থানকে বৈষম্যমূলক করেছে। আদিম সমাজ থেকে সামন্তবাদী ব্যবস্থায় পুরুষ তার জৈবিক পার্থক্যকে কাজে লাগিয়ে নারীর উপর আধিপত্য কায়েম করেছে। এই পার্থক্য নির্মাণে দুটি বিষয় ভূমিকা নিয়েছে- একটি হল পুরুষের মাংশপেশির শক্তি, অন্যটি হল নারীর প্রজননে ব্যাপৃত থাকা। নারী কাজ করতে বাধ্য এবং অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে, ফলে যে সমাজ এবং সামাজিক প্রথা তৈরি হয়েছে, তা নারীর বিপক্ষে গেছে। পুরুষ কায়েম করেছে পিতৃতন্ত্র, এখানে পিতা মানে পুরুষ।
উৎপাদনের প্রকৃতি অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে পুরুষকে সব সময় উদ্ভাবনীমূলক চিন্তা করতে হয়েছে এবং করেছে। তারা তাদের অস্তিত্বের প্রশ্নে প্রকৃতিকে বদলে যুৎসই অস্ত্র তৈরি করেছে, কিন্তু নারী বছরের পর বছর একই কাজ করে গেছে। এই যে নারীর বৈচিত্র্যহীনতা, তা পুরুষকে সুবিধা দিয়েছে এবং শত শত বছর ধরে এটা চলে এসে সামাজিক প্রথায় পরিণত হয়ে গেছে। নারী পরাজিতের জীবন যাপন করেছে। নারীর কাজের মূল্যায়ন হয়নি, মূলত শারীরিক শক্তি দিয়ে জয়পতাকা উড়িয়েছে পুরুষ।
পুরুষের এই আধিপত্যকে প্রথম আঘাত করেছে পুঁজিবাদ। শিল্প বিপ্লব প্রয়োজন ঘটিয়েছে অধিকতর শ্রমের, তখন বাস্তব প্রয়োজনে নারী ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে, পিতৃতান্ত্রিক অহমিকা ভেঙে পড়তে শুরু করে তখন থেকেই। পুঁজিবাদ আবিষ্কার করতে থাকে নতুন নতুন যন্ত্র এবং প্রযুক্তি যা শারীরিক শক্তির বিষয়টিকে গৌণ করে ফেলতে শুরু করে। নারী ক্রমে দক্ষ হয়ে উঠতে শুরু করে। দেখা যায় শারীরিক শক্তির সামান্য পার্থক্য সত্ত্বেও সমান যোগ্যতায় কাজ করতে থাকে নারী। ভুল ভাংগতে শুরু করে সামাজিক ট্যাবুগুলির। নারী ছড়িয়ে পড়ে উৎপাদনের সব শাখায়। প্রজননের উপর মানুষ নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে, গর্ভনিরোধক আবিষ্কার নারীকে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দেয়। কিন্তু নারীর মুক্তি ঘটে না। অর্থনৈতিক বৈষম্য ক্ষমতার আর এক খুটি হয়ে দেখা দেয়।
একে ভাঙায় এখন নারীর কাজ। প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান যত এগিয়ে যাবে, যত শারীরিক শক্তির বিষয় গৌণ হয়ে যাবে, পুরুষ আধিপত্য মিলিয়ে যাবে। এই কাজে নারী যত সৃজনশীল কাজে নেমে পড়বে, পুরুষতন্ত্র তত তার আধিপত্য খোয়াবে।
নারীবাদের কাজ বিচিত্র সৃজনশীল এবং উদ্ভাবনীমূলক কাজে বেশি বেশি যুক্ত হয়ে পড়া এবং নারী যে কোন কাজেই ঊণ নয়, বরং সমান কিংবা কোন কোন ক্ষেত্রে বেশি তা প্রমাণ করা।
৬
Add a Comment