লিটমুড
Published : 31 Dec 2025, 01:42 PM
মাঝে মাঝে এমন সময় আসে যখন ইতিহাসের চাকা সামনে না চলে পিছিয়ে যায় কয়েক শতাব্দী।
৪১৫ খ্রিষ্টাব্দ, এমন এক সময় যখন আলেকজান্দ্রিয়ার রাজপথে এক বিদুষী নারীর রক্তে লেখা হয়েছিল একটি যুগের সমাপ্তি। তিনি হাইপেশিয়া— ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ নারী গণিতজ্ঞ, দার্শনিক এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী। যাকে হত্যার মাধ্যমে পৃথিবী প্রবেশ করেছিল দীর্ঘ এক হাজার বছরের অন্ধকার যুগে।
৩৭০ খ্রিষ্টাব্দে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় যখন হাইপেশিয়ার জন্ম হয়, তখন পৃথিবী ছিল পুরুষতান্ত্রিকতার চরম শিখরে। সেই প্রতিকূল সময়ে তার পিতা থিওন ছিলেন একজন বিখ্যাত গণিতবিদ এবং আলেকজান্দ্রিয়া মিউজিয়ামের শেষ পরিচালক। থিওন কেবল একজন পিতা ছিলেন না, ছিলেন এক দূরদর্শী শিক্ষক। তিনি চেয়েছিলেন তার কন্যা যেন কেবল পুরুষের সম্পত্তি হিসেবে নয়, বরং একজন ‘পূর্ণাঙ্গ মানুষ’ হিসেবে বড় হয়।
থিওনের তত্ত্বাবধানে হাইপেশিয়া শরীরচর্চা, অশ্বারোহণ এবং সাঁতারের পাশাপাশি গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ও দর্শনের গভীর পাঠ গ্রহণ করেন। সমকালীন ঐতিহাসিকরা তাকে বর্ণনা করতেন ‘পরমা সুন্দরী আফ্রোদিতির দেহে প্লেটোর আত্মা’ হিসেবে। কিন্তু তার সৌন্দর্যের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা।
আলেকজান্দ্রিয়ার পাঠশালায় জ্ঞানের আলোকবর্তিকা তিনি।
শিক্ষা শেষে হাইপেশিয়া আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত ও দর্শনের শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগার ও শ্রেণিকক্ষে যখন তিনি বক্তৃতা দিতেন, তখন দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা মুগ্ধ হয়ে তা শুনতে আসত। তার ছাত্রদের মধ্যে অনেক বিখ্যাত খ্রিস্টান ব্যক্তিত্বও ছিলেন, যাদের মধ্যে অন্যতম সাইরিনের সিনেসিয়াস। সিনেসিয়াসের চিঠিপত্র থেকে জানা যায়, হাইপেশিয়া কেবল একজন শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন এক অসামান্য বক্তা ও পরামর্শক।
তিনি প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের দর্শন নিয়ে আলোচনা করতেন, যা তৎকালীন সময়ে ছিল অত্যন্ত সাহসের কাজ। তিনি বিশ্বাস করতেন মুক্তবুদ্ধিতে। তার বিখ্যাত সেই দর্শন আজীবন অনুপ্রেরণা দেয়: “তোমার চিন্তা করার অধিকার সংরক্ষণ করো। এমনকি ভুলভাবে চিন্তা করা একেবারে চিন্তা না করা থেকে উত্তম।”
হাইপেশিয়া কেবল দর্শনের জগতে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। গণিত ও যন্ত্রকৌশলে তার অবদান তাকে ইতিহাসের অমরত্ব দিয়েছে:
১. ইউক্লিডীয় জ্যামিতি: তিনি ও তার বাবা যৌথভাবে ইউক্লিডের ‘এলিমেন্টস’ গ্রন্থের নতুন সংস্করণ তৈরি করেন, যা আজও পাঠ্যপুস্তক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
২. অ্যারিথমেটিকা ও কনিক সেকশন: দায়োফ্যান্টাসের ‘অ্যারিথমেটিকা’ এবং অ্যাপোলোনিয়াসের ‘কনিক সেকশন’ এর ওপর তার দীর্ঘ আলোচনা গণিতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৩. অ্যাস্ট্রোলেব ও হাইড্রোস্কোপ: আকাশ পর্যবেক্ষণের সূক্ষ্ম যন্ত্র ‘অ্যাস্ট্রোলেব’ পরিমার্জন এবং তরলের ঘনত্ব মাপার জন্য ‘হাইড্রোস্কোপ’ উদ্ভাবন তাকে একজন সফল উদ্ভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এছাড়া পানির স্তর মাপার জন্য তিনি একটি বিশেষ যন্ত্র তৈরি করেছিলেন।
অন্ধকার শক্তির উত্থান ও রাজনৈতিক সংঘাতে হাইপেশিয়া হেরে যান। তৎকালীন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বের শিকার তিনি। একদিকে ছিলেন আলেকজান্দ্রিয়ার নগরপাল অরিস্টিস, যিনি হাইপেশিয়ার মেধা ও বুদ্ধির ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল ছিলেন। অন্যদিকে ছিলেন খ্রিস্টান আর্চবিশপ সিরিল। সিরিল হাইপেশিয়ার এই রাজনৈতিক প্রভাব এবং তার প্যাগান (অ-খ্রিস্টান) পরিচয়কে সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি।
সিরিলের চোখে হাইপেশিয়া ছিলেন ‘সাপের চেয়েও ধূর্ত’ এবং তার যুক্তি ছিল খ্রিস্টধর্মের বিস্তারে প্রধান অন্তরায়। তিনি প্রচার করতে শুরু করেন যে, নগরপাল অরিস্টিসের সাথে চার্চের বিরোধের মূল কারণ হলো এই ‘পাপী’ নারী। তৎকালীন কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ ও ধর্মোন্মাদদের কাছে হাইপেশিয়ার মুক্তবুদ্ধি ছিল অসহনীয়।
৪১৫ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসের এক দিনে হাইপেশিয়া যখন তার ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যাচ্ছিলেন, তখন পিটার নামক এক ব্যক্তির নেতৃত্বে একদল ধর্মোন্মাদ তাকে ঘিরে ফেলে। তারা তাকে গাড়ি থেকে টেনে-হিঁচড়ে নামিয়ে কেসারিয়াম নামক একটি চার্চে নিয়ে যায়।
সেখানে ইতিহাসের সেই চরম বর্বরতা মঞ্চস্থ হয়। এই বিদুষী নারীকে নগ্ন করা হয় এবং ধারালো ঝিনুক ও ভাঙা মাটির পাত্রের টুকরো দিয়ে তার শরীরের চামড়া ও মাংস চেঁছে আলাদা করা হয়। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ না করা পর্যন্ত তার ওপর চলে অকথ্য নির্যাতন। মৃত্যুর পর তার দেহ টুকরো টুকরো করে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়। ইতিহাসের এই ঘৃণ্যতম অপরাধের নির্দেশদাতা হিসেবে আর্চবিশপ সিরিলকে অভিযুক্ত করা হলেও পরবর্তীতে তাকে ‘সেন্ট’ বা ‘সন্ত’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
এখান থেকেই শুরু হলো অন্ধকার যুগের সূচনা; এক হাজার বছরের স্তব্ধতা
হাইপেশিয়ার মৃত্যুর সাথে সাথেই আলেকজান্দ্রিয়ার সেই স্বর্ণালি যুগের অবসান ঘটে। এটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই পশ্চিমা বিজ্ঞানের এক বিশাল পরাজয়। তার মৃত্যুর পর ইউরোপে গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ও পদার্থবিদ্যার চর্চা থমকে যায়। জ্ঞানচর্চার স্থান দখল করে নেয় ধর্মীয় আস্ফালন, কূপমণ্ডূকতা আর বর্বরতা। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, এই একটি হত্যাকাণ্ড পৃথিবীকে প্রায় এক হাজার বছর পিছিয়ে দিয়েছিল। মুক্তচিন্তার সেই বাতিঘর নিভে যাওয়ার পর পুরো মধ্যযুগ কাটে বিজ্ঞানের অন্ধকার অরণ্যে।
আধুনিক যুগে হাইপেশিয়ার পুনর্জন্ম
দীর্ঘ তেরশ বছর পর ১৭২০ সালে জন টোলান্ডের হাত ধরে হাইপেশিয়া আবার জনসমক্ষে আসেন। ভল্টেয়ার থেকে শুরু করে বার্ট্রান্ড রাসেল—সবাই হাইপেশিয়ার আত্মত্যাগকে বর্ণনা করেছেন বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে অন্ধত্বের লড়াই হিসেবে। ১৮৫৩ সালে চার্লস কিংসলের উপন্যাস ‘হাইপেশিয়া’ তাকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করে তোলে।
বর্তমানে হাইপেশিয়া কেবল একজন ঐতিহাসিক চরিত্র নন, তিনি নারী অধিকার ও মুক্তচিন্তার আন্দোলনের প্রতীক। তার সম্মানার্থে চন্দ্রপৃষ্ঠের একটি গর্তের নাম রাখা হয়েছে ‘হাইপেশিয়া ক্রেটার’। ২০০৯ সালে স্প্যানিশ চলচ্চিত্র ‘এগোরা’ তার জীবনকে নতুন করে সেলুলয়েডের পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছে।
হাইপেশিয়া ছিলেন নক্ষত্রের এক উজ্জ্বল অশ্রুবিন্দু। তিনি এমন এক সময়ে জন্মেছিলেন যখন পৃথিবী অন্ধত্বের দিকে যাচ্ছিল, আর তিনি শেষবারের মতো যুক্তির আলো জ্বালাতে চেয়েছিলেন। হাইপেশিয়ার জীবন আমাদের শিক্ষা দেয় যে, বিজ্ঞান আর মুক্তবুদ্ধির পথ সবসময়ই কণ্টকাকীর্ণ, কিন্তু এই আলোর মশাল ছাড়া সভ্যতা কখনও অন্ধকারের হাত থেকে মুক্তি পায় না।
আজকের যুগেও যখন আমরা বিজ্ঞানমনস্কতা আর ধর্মের সংঘাত দেখি, তখন হাইপেশিয়া বারবার ফিরে আসেন আমাদের মাঝে—এক কালজয়ী অনুপ্রেরণা হয়ে।
Add a Comment