লিটমুড
Published : 10 Jan 2026, 02:59 PM
অনিমেষ আমার প্রিয় নামগুলোর একটি। গল্পের নায়কের নাম খুঁজতে গেলে আমার প্রথমেই যে নাম মনে আসে- তা হলো, অনিমেষ। অনিমেষ নামটায় একটা সততা আছে, আমার তাই মনে হয়। অনিমেষ; যে নিমেষ না ফেলে তাকিয়ে থাকতে পারে। নির্নিমেষ- অপলক। চোখে চোখ রেখে কথা বলা অতো সহজ নয়, তাই যেহেতু নায়কের নাম, সেজন্য প্র্থমেই আসে অনিমেষ। অনিমেষ নামে এক উদ্যমী যুবক আছে বরিশালে। সে বিএ পাশ করে তার সারা গ্রাম জুড়ে মালটার চাষ করেছে। অর্থাৎ কমলালেবুই বলা চলে
প্রজাতি এক। ধান বানতে শীবের গীত গাইছি হয় তো। মালটা- কমলালেবু। জীবন তো এক কমলালেবুই। কমলালেবুর আরেক নাম যদি দেই মাল্টা। তবে, জীবনের আরেক নাম অনিমেষ। ওই উদ্যমী যুবককে আমার ভালো লাগে। তাই গল্পের নাম দেই, অনিমেষের মাল্টা বাগান। একটি মালায়লাম গল্প অনুবাদ করেছিলাম দুই হাজার পাঁচ সালে। নায়কের নাম মুকুন্দন। আমার পছন্দ হয় না। অন্যায় জেনেও তার নাম পাল্টে রাখি অনিমেষ। এবার চরিত্রের সঙ্গে ঠিক মানিয়ে যায় নামটি। দুঃখিত প্রিয় আহসান হাবীব। আমি আপনার উপন্যাস অনিমেষের পাঠ প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে, আপনার কাঁধে বন্দুক রেখে নিজেকে জাহির করলাম। ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেননা, মানুষ আজকাল কতো কিছুতেই না নিজেকে জাহির করে। আমিও না হয় করলাম। কবি মনীন্দ্র গুপ্ত বলেছিলেন, পৃথিবীতে শব্দ কমুক। গাছপালা পশুপাখি বাড়ুক। কিন্তু আমি আজ কিছুতেই শব্দ কমাতে পারছি না। বাহুল্য হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নিজেকে জাহির না করতে পারলে আমার জল বিনে মাছের মতো অবস্থা হতো। আমার শ্বাসকষ্ট হতো! লিখতে পেরে এবার লম্বা করে শ্বাস নিলাম। হু! হ্যাঁ তো অনিমেষ, একটি নতুন উপন্যাস। ২০১৯ সালের গ্রন্থমেলায় প্রথম প্রকাশ। লেখক আহসান হাবীব। উপন্যাসের নায়কের নামে নামকরণ। শুরুতেই ভয়ঙ্কর এক হা। শিওরে ওঠার মতো এক দানবীয় হা। মরা মানুষের স্কেচ! নাকি মৃত্যুদূতের! বইটি হাতে পেয়েছি তিন মার্চ, ২০১৯। হয়তো তখন আমার কোনো স্নায়ু দুর্বল ছিলো। তাই রক্ত হিম করা ওই ছবিটি দেখে বইটি ঠাস করে বন্ধ করে দেই।
০২
তবুও বইটিকে সঙ্গে করে বাড়ি থেকে কর্মস্থলে যাই। উল্টেপাল্টে দেখি। ভেতরে খুঁজতে থাকি, যদি কোনো শব্দ আমার মনোযোগ আকর্ষণ করে! প্রচণ্ড গরমে সিএনজিতে বসে, জ্যামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকার অবস্থা হলে, আমি বইটি খুলি
কিন্তু বিজয় সরণির হকার, হিজড়া, আর ভিক্ষুকের আগমনে বিভ্রাট ঘটে। আমি রিডিং গ্লাস খুলে কালো সানগ্লাস পরে বসে থাকি। হেল! অফিসে গিয়ে একের পর এক ধর্ষণের খবরে মেজাজ এতোটাই রুক্ষ হয়ে যায় যে, আমি সূক্ষ্ণরস আস্বাদনের মনটাই হারিয়ে ফেলি। আমি পাঠক হিসেবে একেবারে অদ্ভিত। প্রথমেই ফ্ল্যাপ পড়ি না। সাসপেন্স হারিয়ে যাবে বলে। এই বইটির বেলায়ও তাই। এভাবে বইটি তিনদিন অফিসে যায় এবং বাসায় আসে। আমি জানিনা, কোনো কারণে হয়তো কিছুতেই সেসময় আনন্দ পাচ্ছিলাম না। অবশেষে, ঠিক চারদিন, চার রাত্রি পর একটি অনুচ্ছেদে আমার চোখ আটকে গেলো-
" সে চাঁদের দিক থেকে চোখ নামিয়ে আনে, জোৎস্নার দিকে তাকায়, কই কোনো কলঙ্ক তো নেই, কী অসাধারণ মসৃণ আলো। কোনো উত্তাপ নেই, একটা পরিচ্ছন্ন চাদর যেন বিছিয়ে রেখেছে পৃথিবীর উপর। আর সে আলোয় উদ্ভাসিত পৃথিবী এক রহস্যময় নারীর মতো খিলখিল করে হাসছে।" খিলখিল শব্দটা আমার পছন্দ। দেখলাম, লেখকও লিখেছেন, খিলখিল শব্দটা অনিমেষের পছন্দ। আহা! সিসিম ফাঁক! আমি আলীবাবার রহস্যময় হীরা-জহরতপূর্ণ ডেরায় প্রবেশের চাবি পেয়ে গেলাম। এতো সুন্দর, সাবলীল ভাষা। স্বত:স্ফূর্ত ঝর্ণার মতো গড়িয়ে নামছে কলকল রবে। মনে, হলো, হ্যাঁ, ঠিক এই ভাষাটাই যেন চাইছিলাম!( দীর্ঘদিন সমসাময়িকদের গদ্য, তরুণরা ছাড়া, পাঠ করতে পারতাম না। ক্লীশে, ম্যাড়মেড়ে মনে হতো।) অতঃপর, শুরু হলো পাঠ। অনিমেষ এক আপাদমস্তক বিজ্ঞানমনষ্ক, মানবিক চরিত্র। তার চিন্তার ম্তর বলে দেয়, জীবন-জগৎ সম্পর্কে তার ধারণা স্পষ্ট। তার পাঠ পরিপক্ক। তার প্রকৃতি ভালো লাগে, তার শিশুদের ভালো লাগে। জীবনকে গতিময় রাখতে সে ফুটবল খেলে। আমি তার ড্রিবলিং, তার সাম্বা হরিণের মতো গতি দেখতে পাচ্ছিলাম। বুকের ভেতর তার ফুসফুসটাও ফুটবল মাঠের সমান প্রাণশক্তি ধারণ করে।
০৩
এবার আমি শুরু থেকে মনে করতে চাই। - এতো প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর একটা মানুষের মৃত্যুচিন্তা আসে কেন? আসতেই পারে। কোথা থেকে এলাম, কোথায় যাবো, এটি প্রথম দার্শনিক প্রশ্ন। অনিমেষ ভেবে পায় না, তার মৃত্যু কীভাবে হবে! তার শরীরে কোনো রোগের লক্ষণ নেই। সে কীভাবে মারা যাবে এমন ভাবনা তাকে পেয়ে বসে। তার মৃত্যুচিন্তা হঠাৎ বাঁক বদল করে। একটি মৃত্যু আর একটি হারিয়ে যাওয়া তাকে তছনছ করে দেয়
তাকে, রূপান্তরিত করে অন্য অনিমেষে। উপন্যাসের এ পর্যায়ে টানটান উত্তেজনা। 'নো এক্সিট 'ছবিটির কথা মনে হচ্ছিল। আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছিল না নায়কটি। ভোর হওয়া অব্দি একের পর এক দুর্ঘটনা, মৃত্যু তাকে হন্ট করতে থাকে। অবশেষে ভোর আসে। অনিমেষের জীবনেও হঠাৎ শীতল গীতল পরশ আসে। কিন্তু পাঠিকাকে ভুল প্রমাণ করেন লেখক। অনিমেষের প্রাক্তন প্রেমিকার সঙ্গে দেখা হলো আইসিইউ এর সামনে। মৃত্যুপথযাত্রী স্বামীসমেত। প্রেম প্রেম ভাব তো দূরে থাক। বেচারা অনিমেষ প্রেমিকার জন্য কোনো সান্ত্বনাবাক্য খুঁজে পায় না। স্বামী মরে গেলে অনিমেষ বাকরহিত। কেননা সে তখন প্রাক্তন প্রেমিকার চেয়েও প্রিয় মানুষের বিয়োগব্যথায় কাতর। এরপর একের পর এক ঘটনা, দুর্ঘটনা। এতো দ্রুত ঘটে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। বুঝলাম বয়স হয়েছে। টানা পড়া যাবে না। একটু হাঁটি, একটু কাজ করি। তারপর রাত পার করে ভোরে ঘুম থেকে উঠি। বৃহস্পতিবার দুপুর! চৈত্রের রোদ তাঁতিয়ে উঠছে। আমি রোদের ঘ্রাণ, রোদের তাপে ভাঁপ-ওঠা মাটির ঘ্রাণ পাচ্ছি। দূর কোন পরগনা থেকে যেন কাটা ঘাসের গন্ধ ভেসে আসে। কাটা ঘাসের গন্ধ- কাম জাগানিয়া। আর কাম মৃত্যুগন্ধী।
অনিমেষ তখন বুড়িগঙ্গার ধারে।
" বাস থেকে নেমেই তার ভয় করতে থাকে"। আমারও। কেননা ততক্ষণে আমি কাম আর মুত্যুগন্ধ টের পাচ্ছিলাম।
" দশ বছরে সে ঢাকা শহর ছেড়ে অন্য কোথাও গেছে, মনে পড়ে না। অফিসের কাজে কিংবা আনন্দভ্রমণ কোনোটাই সে করেনি। সে একটা ফুটবল টিম গড়ে তুলেছিল। এই টিমকে ঘিরেই তার আনন্দ! আর এই টিমটাই অবশেষে তার জীবনে ঝড় নিয়ে আসে। "
মৃত্যু অনুসন্ধানী অনিমেষ- নির্নিমেষ হয়ে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। কালো পিচে লার রক্তের ধারা জমাট বেধে আছে। একটা কনটেম্পোরারি আর্টের মতো অনিমেষ শুয়ে থাকে মহাসড়কে। উপরে বিশালায়ন শূন্য। নক্ষত্র কি দেখা যায়! পাঠক নিশ্চয়ই খুঁজে
Add a Comment