লিটমুড
Published : 10 Jan 2026, 03:13 PM
‘মানুষ আসলে কবিতা লেখে মৃত্যুর পরে।’ এ কথাটি সত্য অন্তত তাঁর বেলায়। না গতানুগতিক কোনো লেখক কিংবা কবি ছিলেন না তিনি। তবুও তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে রচিত হয়েছে পৃথিবীর অমর কবিতা। যে কোনো কালজয়ী কবিতার মতোই কালোত্তীর্ণ তাঁর এই শেষ বার্তা।
সালভাদর আলেন্দে (সঠিক উচ্চারণ আইয়েন্দে)। লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম সমাজবাদী মার্কসবাদী প্রেসিডেন্ট, যিনি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১৯৭০ সালে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেবার পর আলেন্দে শিল্প জাতীয়করণ এবং সম্মিলিত কৃষিচাষ ব্যবস্থা নীতি অবলম্বন করলে দেশের সমাজতান্ত্রিক বিরোধী আইনপ্রণেতাদের এবং বিচার বিভাগের সঙ্গে শীতল সম্পর্কে জড়ান। ক্ষমতালোভীদের তাকে বিরোধিতা করার পেছনে আরও অনেক কারণ ছিল। সেই সব কারণের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চিলির সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থান ঘটায় একনায়ক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া জেনারেল পিনোশের নেতৃত্বে। সেনারা লা মোনেদা প্রাসাদ ঘিরে ফেললে আলেন্দে পদত্যাগ করতে অস্বীকার করেন। ওইদিনই তিনি নিহত হন। এর আগে তিনি জাতির উদ্দেশ্যে এক বেতার ভাষণ দেন। তার মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি করা হয় নানা ধোঁয়াশা। বলা হয়ে থাকে বেতার ভাষণের পরই তিনি আত্মহত্যা করেন। তবে বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে যে তার মৃত্যু হয়েছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
সালভাদর আলেন্দের পুরো নাম সালভাদর গুইলেরমো আলেন্দে গোসেন। ১৯০৮ সালের ২৬ জুন চিলির ভ্যালপারাইসোতে তার জন্ম। তার বাবার নাম সালভাদর আলেন্দে ক্যাস্ট্রো এবং মায়ের নাম লরা গোসেন ইউরিব। ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। চিলি বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি র্যাডিক্যাল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হন। ১৯২৬ সালে তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৩৩ সালে তার ‘ডক্টরাল থিসিস: ক্রাইম অ্যান্ড মেন্টাল হাইজিন’ প্রকাশিত হয়।
তিনিই বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্রনায়ক যিনি গণতান্ত্রিকভাবে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা স্থাপনের সাহস দেখিয়েছিলেন। তার গৃহীত নানা পদক্ষেপ সাম্রাজ্যবাদী এবং সুবিধাভোগীদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর চূড়ান্ত প্রক্রিয়া সমাপ্ত হয়। আলেন্দে বলেছিলেন, তার আত্মদান কখনো বৃথা যাবে না। আলেন্দে তার কথিত আত্মহত্যার আগে বেতার ভাষণে বলেন: “আমার দেশের কর্মীরা, চিলি এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার আস্থা আছে। অন্যরা এই অন্ধকার ও তিক্ত মুহূর্তের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।”
এর পরপরই পিনোশের সরকার ক্ষমতা হাতে তুলে নেয়। ১৯৭৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চিলিতে পিনোশের স্বৈরশাসনের সময় কয়েক হাজার মানুষ নিহত ও নিখোঁজ হয়। নির্যাতনের শিকার হন হাজার হাজার মানুষ। কবি পাবলো নেরুদা ছিলেন আলেন্দের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করার পর নেরুদা চিলিতে ফিরে এলে সালভাদর আলেন্দে এস্তাদিও ন্যাশনালে ৭০ হাজার লোকের সামনে তাকে ভাষণ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান। চিলিতে পিনোশের নেতৃত্বাধীন সামরিক অভ্যুত্থানের সময়েই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন নেরুদা। তিন দিন পরেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়। তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া জনসমক্ষে করার অনুমতি দেয়নি পিনোশে। যদিও হাজার হাজার মানুষ সেদিন কারফিউ ভেঙে পথে ভিড় জমান। পাবলো নেরুদার অন্ত্যেষ্টিযাত্রা পরিণত হয় চিলির সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদে।
শেষ বার্তা
বন্ধুরা আমার! নিশ্চিত এটাই আপনাদের প্রতি আমার শেষ বার্তা। এরই মধ্যে এয়ারফোর্স বেতার ভবনের টাওয়ারের ওপর বোমা বর্ষণ করেছে।
কারো প্রতি কোনো বিদ্বেষ নেই আমার। তবে একটু হতাশ তো অবশ্যই। যারা দেশ ও জনগণের সঙ্গে এবং তাদের নেওয়া শপথের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তাদের জন্য এটা অবশ্যই একটি নৈতিক শিক্ষা হবে। অবশ্যই তাদের জন্য— যে নামমাত্র কমান্ডার-ইন-চিফ অ্যাডমিরাল মেরিনো, যিনি নিজেকে নেভির কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত করেছেন এবং মি. মেনডোজা, যিনি গতকাল নিজেকে সরকারের প্যারামিলিটারি পুলিশের চিফ হিসেবে অধিষ্ঠিত করেছেন।
এই তথ্যগুলো আপনাদের এজন্য বলছি যেন আপনারা সত্যটুকু জানেন। আর সত্য হলো এই— আমি পদত্যাগ করতে যাচ্ছি না। আমার জীবনের এই ঐতিহাসিক বাঁক পরিবর্তনের মুহূর্তে আমি কৃতজ্ঞ আমার জনগণের প্রতি, যারা আমাকে তাদের আনুগত্য দিয়েছেন। আমি অবশ্যই তার মূল্য দেব। আমি তাদের বলতে চাই, আমি নিশ্চিত যে সচেতনতার বীজ বপন করা হয়েছে হাজার হাজার চিলিবাসীর মধ্যে, তা তারা কখনো বিনষ্ট হতে দেবে না। শত্রুদের ক্ষমতা আছে, তারা আমাদের শৃঙ্খলিত করতে পারে, বন্দি করতে পারে, কিন্তু সমাজের চলমান প্রক্রিয়া কখনো অপরাধ আর শক্তি দিয়ে স্তব্ধ করা যায় না। ইতিহাস আমাদের এবং এই ইতিহাস তৈরি করেছে আমাদের জনগণ।
আমার কর্মীরা, আমি কৃতজ্ঞতা জানাই আপনাদের সততার জন্য। আমি আপনাদের বিশ্বাস করি। শ্রদ্ধা জানাই এ কারণে যে, আপনারা এমন একজন মানুষকে আপনাদের বিশ্বস্ততা দিয়েছেন ও তার পাশে থেকেছেন, যে কথা দিয়েছিল সংবিধান এবং আইনকে সমুন্নত রাখবে— এবং এই মুহূর্তেও সে তাই করছে। এই বিশেষ মুহূর্তে আপনাদের প্রতি আমার প্রত্যাশা, এ থেকে আপনারা কিছুটা হলেও শিক্ষা নেবেন। আজকের এই পরিবেশ তৈরি করেছে বিদেশি পুঁজি ও সাম্রাজ্যবাদ। এই দুই শক্তি মিলেমিশে এমন অবস্থার সৃষ্টি করেছে যার কারণে চিলির সৈনিকদের নৈতিকতা ভেঙে গেছে। আর্মড ফোর্স তাদের ঐতিহ্য ভেঙে ফেলেছে। এমনকি অনেকেই এই প্রক্রিয়ার শিকার হওয়া সত্ত্বেও তারা আশা করছে বিদেশি প্রভুরা তাদের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করে তাদের সুখ-সুবিধার দিকে নজর দেবে এবং তাদের সুরক্ষিত রাখবে।
আমি আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই, বিশেষ করে আমাদের দেশের নারীদের, যারা বিশ্বাস করেন আমরা তাদের সন্তানদের জন্য উদ্বিগ্ন। আমি চিলির পেশাজীবী, দেশপ্রেমিক পেশাজীবীদের প্রতি কৃতজ্ঞ, যারা প্রতিনিয়ত পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে তাদের কাজের ধারা অব্যাহত রেখেছেন।
অভিনন্দন জানাই সেই সব তরুণদের, যারা গান গেয়ে আমাদের বিপ্লবের প্রেরণা ও শক্তি জুগিয়েছেন। অভিনন্দন জানাই চিলির গণমানুষকে— সকল শ্রমিক, কৃষক ও বুদ্ধিজীবীদের। আমি জানি আপনারা এর জন্য নির্যাতনের শিকার হতে পারেন, কেননা এরই মধ্যে আমাদের দেশে ফ্যাসিজম তার ডানা বিস্তার করেছে। সন্ত্রাসী হামলা, ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়া, সড়ক ও রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা, তেল এবং গ্যাস লাইন ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। তারা নিভৃতে সংগঠিত হয়েছে। ইতিহাস তাদের বিচার করবে।
আমি নিশ্চিত, যেকোনো মুহূর্তে রেডিও ম্যাগালেনসকে চুপ করিয়ে দেওয়া হবে, ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হবে সমস্ত ধাতব যন্ত্রকে যাতে আমার কণ্ঠস্বর আর আপনাদের কাছে না পৌঁছায়। এতে কিছুই আসে যায় না, কারণ আমার কণ্ঠস্বর আপনারা সবসময় শুনতে পাবেন। আমি সবসময় আপনাদের পাশে থাকব। অন্তত আমার স্মৃতি সবসময় আপনাদের মাঝে অটুট থাকবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আপনারা আমাকে ভুলে যাবেন না। ভুলে যাবেন না তাকে, যে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আত্মসম্মান অক্ষুণ্ণ রেখে নিজের দেশের প্রতি অনুগত ছিল।
আমার জনগণ নিশ্চয়ই নিজেদের রক্ষা করবে, কিন্তু তারা নিজেদের বলিদান হতে দেবে না। জনগণ অবশ্যই এই তিক্ত ও অন্ধকার মুহূর্ত অতিক্রম করবে। বিশ্বাসঘাতকদের মুখোশ একসময় উন্মোচিত হবে। মনে রাখবেন, অদূর ভবিষ্যতে মহৎ ও বৃহৎ পথগুলো উন্মোচিত হবে, যে পথে হেঁটে যাবেন সব মুক্ত মানুষেরা— শ্রেয় সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে।
চিলি দীর্ঘজীবী হোক। জনগণ দীর্ঘজীবী হোক। শ্রমিক দীর্ঘজীবী হোক।
এই আমার শেষ কথা। এবং আমি নিশ্চিত আমার এই আত্মোৎসর্গ বৃথা যাবে না। আমার এই আত্মোৎসর্গ খুব নিকট ভবিষ্যতে অপরাধী, ভীরু ও বিশ্বাসঘাতকদের জন্য একটা নৈতিক শিক্ষা হবে।
স্যান্টিয়াগো ডি চিলি ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩
Add a Comment