লিটমুড
Published : 11 Jan 2026, 03:45 PM
পাবলো নেরুদা পৃথিবীবিখ্যাত কবি। ল্যাটিন আমেরিকার অন্যান্য ভাগ্যাহত দেশের মতো আর এক চিলির অধিবাসী তিনি। ১৯০৪ খ্রী. ১২ই জুলাই তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আর্জেন্টিনা বলিভিয়ার পশ্চিমে দক্ষিণ আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে চিলি একটি স্বাধীন দেশ। চিলির সাহিত্য মূলত স্প্যানিশ এবং স্প্যানিশ ভাষাই কথ্য ভাষা হিসেবে প্রচলিত। এছাড়া জার্মান ও রেড ইন্ডিয়ান ভাষাও প্রচলিত। চিলির সাহিত্য উপনিবেশিকতার প্রথম পর্ব থেকেই কবিতা অর্থাৎ সাহিত্যের এই বলিষ্ঠ মাধ্যমটি বেশ সমৃদ্ধশীল। নেরুদার প্রকৃত নাম নেফতালি রিকার্ডো বিয়েস বামালতো। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত চেক ছোটগল্পকার ইয়াল নেরুদার নামানুসারে নেফতারি বিয়েস নতুন নাম ধারণ করেন। পরবর্তীকালে মাত্র তেইশ বৎসর বয়সেই নেরুদা প্রতিভাবান কবি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তারপর চিলির সরকারী কর্তৃপক্ষ তাকে দূরপ্রাচ্যের কনসাল পদে অধিষ্ঠিত করেন। এই পদে বহাল থাকার সময় তিনি রেঙ্গুন, কলম্বিয়া, বাটাবিয়া, সিঙ্গাপুর, মাদ্রিদ, প্যারিস এবং মস্কো সিটি প্রভৃতি অঞ্চলে কুটনীতিবিদ হিসাবে কাজ করেন। ১৯৩২সালে নেরুদা বুয়েনস আয়ারস কনসাল লোরকার সঙ্গে আর্জেন্টিনায় মিলিত হন। ১৯৩৪সালে স্পেনে যান। কবি ও কবিপতœী স্পেনের কবিদের দ্বারা বিশেষভাবে সম্মানিত হন। ১৯৩৬ সালের ১৯জুলাই ফ্যাঙ্কো উত্তর আফ্রিকা থেকে স্পেন আক্রমন করলে পাবলো নেরুদা কনসাল পদে ইস্তফা দিয়ে প্যারিসে উপস্থিত হন। এবং বাস্তুহারাদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন। এবং আবার ১৯৪৩সালে স্বদেশ চিলিতে ফিরে আসেন। ১৯৪৫ সালে তিনি চিলির কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। এবং চিলির কনি এলাকা আন্তো যোগাস্তার শ্রমিক অঞ্চরে সিনেটর নির্বাচিত হন।
নেরুদার গ্রন্থাবলীর মধ্যে ক্রেপাশকুবালি ১৯২৩, টুয়েন্টি পোয়েমস অব লাভ এন্ড ডেসপারেট সং ১৯২৪, দ্য এটেম্পটস অব ইনফিনিটিম্যান ১৯২৫, থার্ড রেসিপেন্ট ১৯৪৭, জেনারেল সং ১৯৫৪, এলিমেন্টাল ওডস ১৯৫৪, ফার ওয়ান্ডারিংস ১৯৫৮, কিংস এন্ড রিটার্নিংস ১৯৫৯ প্রভৃতি উলে¬খযোগ্য।
পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় তাঁর বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থ অনুদিত হয়েছে। এবং বিভিন্ন দেশের কাব্যমোদী মহলের কাছে তিনি বিশেষভাবে প্রিয়। পাবলো নেরুদার খ্যাতি শুধুমাত্র কমুনিস্ট কবি হিসেবে নয়। মানবতাবোধ ও সর্বহারা মানুষের কথাই তার কবিতায় শব্দ এবং বিষয়বস্তু। তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু প্রকৃতির চেয়ে মানুষকে কেন্দ্র করেই।
চৌদ্দ বছরের দীর্ঘ সাধনার পর নেরুদা তার বিখ্যাত গ্রন্থ ক্যান্টো জেনারেল সমাপ্ত করেন ১৯৫০সালে এবং পাবলো পিকাসো ও পলরোবসনের সঙ্গে শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করেন। রাজনৈতিক কারণে লাঞ্চিত হবার আশঙ্কায় তিনি ১৯৪৮ সালে তিনি চিলি পরিত্যাগ করেন। এবং ১৯৫২সালে নেরুদা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। এবং ১৯৫৩ সালে অর্থাৎ সেই সময়েই স্তালিন পুরস্কার লাভ করেন।
চিলির মার্কিন দূতাবাস আমেরিকান একাডেমী অব আর্টস এন্ড লেটার্সের স্নাতক চিহ্ন উপহার দিতে গেলে নেরুদা তা ১৯৬৮সালে প্রত্যাখ্যান করেন। নেরুদা সমাজের সমস্ত শ্রেণীর মানুষের সুখ দুঃখ ও হাসি কান্নাকে অনায়াসে কবিতায় রূপান্তরিত করতে পারতেন। তিনি তার কবিতায় অধিকাংশ ই ল্যাটিন আমেরিকার শ্রমিকদের জীবনযাত্রা ও জীবনোপলব্ধিকে কবিতায় রূপান্তরিত করেছেন। তিনি তার নিজের লেখা কবিতায় যে স্বীকারোক্তি করেছেন তা জীবনানন্দের স্বীকারোক্তির কথাই মনে করিয়ে দেয়।
‘‘আমি থিওকিরিটাস নই”
আমি জীবন পেয়েছি, জীবনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি। তাকে চুম্বন করেছি, জয় করেছি, তারপর নেরুদার ভেতর গুহার মধ্য দিয়ে হেঁটে গেছি। কেমন করে মানুষ জীবন কাটায় তা দেখবার জন্য। মিগুয়েল অটেরো সিলভারকে চিঠি। এবং অন্য কবিতায় রাস্তার বন্ধুরা ১৯২১ সালে লেখা কবিতায় তিনি বলেন,
তারপর কুয়াশা বৃষ্টিতে অর্থহীন ভিজে রাজধানীতে পৌঁছলাম-ওগুলো কোন রাস্তা? ১৯২১এর পোশাক থেকে ভুর ভুর করে গ্যাস কফি ও ইটের গন্ধ।
এই কবিতায় তিনি তার স্যান্টিয়াগোর স্কুল জীবনের কথা বলেছেন। তাঁর দেশের নির্যাতিত সাধারণ মানুষের কথা এমনভাবে আর কেউ বর্ণনা করতে পারেননি। ভাষায় রূপ দিতে পারেননি। রাস্তার লোকদের আর খনি শ্রমিকদের সেই বন্ধু আজ আর নেই। সম্প্রতি চিলির একটা অভ্যূত্থানের সময় তিনি আততায়ী কর্তৃক নিহত হন। প্রথমে সংবাদ মাধ্যমে তার নিহত হবার খবর এলেও পরে জানা যায়, সামরিক জান্তা কর্তৃক গৃহান্তরীণ অবস্থায় নেরুদা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। ;সম্পাদক বিপ¬বী চে গুয়েভারা তাঁর কবিতার অসীম ভক্ত ছিলেন। সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করার সময় কিউবা ও বলিভিয়ায় গেরিলা যুদ্ধের সময় ভবঘুরে বিপ¬বী চে গুয়েভারার সঙ্গে সবসময় নেরুদার কবিতার বই থাকতো। তিনি ১৯৭১সালে নোবেল পুরস্কার পান।
গণবাংলা ২৮সেপ্টেম্বর১৯৭৩
(সাবদার সিদ্দিকির কোনো পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্থ ছিলোনা। তার মুঠো খুলে বিলিয়ে যাওয়া পঙক্তিমালা জড়ো করে ১৯৯৭ সালে মুনীর মোরশেদ ‘ঘাস ফুল নদী’ প্রকাশনা সংস্থা থেকে বের করেন ‘সাবদার সিদ্দিকি কবিতা সংগ্রহ’। কবিতা রচনাতেই তার উৎসাহ ছিলো। একটি মাত্র গদ্য রচনা পাওয়া গেছে তার। পাবলো নেরুদার মুত্যুর পর প্রকাশিত হয় লেখাটি ১৯৭৩ সালে। )
Add a Comment