লিটমুড
Published : 30 Dec 2025, 05:19 PM
বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই বলতে এক ঘোরের মধ্যে আছি। ঠিক ঘোর নয়- বেদনাবোধ, যন্ত্রণাসিক্ত। সন্ধ্যা থেকে ভোর চারটা অবধি পাঠ করলাম কথা সাহিত্যিক নাসরীন জাহানের উপন্যাস ‘র্সূযাস্তের শেষ রঙ’।
বেশি বড় বই নয়, অল্প সময়ে পড়া যায়। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছিল যেন ১৫ বছর ধরে বইটির ভেতরে আছি- যাবজ্জীবন কারাবাসের মতো। যেন এক দুর্যোগের রাত আর শেষ হবে না। কখন ভোর হবে এই প্রত্যাশায় বসে আছি।
হয়তো কেউ কেউ একটানা বইটি পড়ে ফেলতে পারবেন। কিন্তু আমি পারি নি। প্রতœ অভিযানের মতো থেমে থেমে পথ চলেছি। কখনো শ্লথ, কখনো কুঁেজা হয়ে। কখনো ঝর্ণার মতো নির্ভাবনায়। একটু আনন্দ আবার বিষাদ। থমকে গেছি , বই বন্ধ করে বসে থেকেছি। আবার শুরু করেছি।
গুণে গুণে অন্তত সাতবার পড়া থামিয়েছি। হতচকিত স্তম্ভিত হয়ে বসে থেকেছি। চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে কখনো। বুকের ভেতর শ্বাস আটকে যাচ্ছে, কখনো গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়েছে। শেষমেষ ফুঁপিয়ে কেদে ওঠা।
নাসরীন জাহান এমনই। তার লেখার জাদুতে পাঠককে ঘোরের মধ্যে ঢুকিয়ে দেন । আলো ফেলে ফেলে দেখান- তুমি দেখবে না! দেখতেই হবে। দ্যাখো এখানে আলোর নিচে কেমন অন্ধকার! কেমন ক্লেদ, কেমন পঙ্ক! জীবন অতো সহজ নয়, সোনা! এই যে প্রতিদিন দেখছো লোকে কাজ করছে, খাচ্ছে-দাচ্ছে-ঘুমাচ্ছে! এর আড়ালে কী আছে দেখেছো কখনো? দেখেছো তরুণী সুন্দরী হলে কী হয়! দেখেছো বখাটে তুলে নিয়ে গেলে কেমন নরক হয় তার তরুণীটির জীবন? তার পরিবার? তার প্রতিবেশ কেমন কওে পাল্টে যায়! দেখেছো কন্যার চেয়ে মা সুন্দরী হলে কী হয়! কন্যার মনে বিষবৃক্ষের বীজ বুনে দিলে কী হয়, জানো?
শুধু কি একজন মা-ই কন্যাকেই বড় করতে পারে! সৃজনশীল কওে তুলতে পারে! সমাজ তো রেডি হয়েই আছে তোমার কন্যার জীবন ধ্বংস করবে বলে। বিষ ভরে দেয়ার জন্য। তার নরম মেধায় আক্রোশ বুনে দেয়ার জন্য।
‘ওই দ্যাখ তোর মা ড্যাং ড্যাং করে বাইরে যাচ্ছে। ’
‘পরপুরুষ না হলে তো তার চলবে না।’
যেন মা- টির আর কোনো কাজ নেই পরপুরুষকে আকর্ষণ করা ছাড়া।
যেন সমাজ খুব এসে দু’বেলা ভাত-কাপড়, কন্যার লেখাপড়ার খরচ দিয়ে যায়!
মেয়ের চেয়ে মা সুন্দর! তাহলে তো গেছে সেই নারী!
‘হায়! হায়! এটা তোমার মেয়ে! ও কার মতো হয়েছে? বাপের মতো? এই মেয়েকে নিয়ে অনেক ভুগতে হবে। বিয়ে তা দেয়া তোম দায়িত্ব তোমার ওপর!’
‘বাবা নেই? আহা! তোমার সামনে পুরো জীবন পড়ে আছে, তুমি কি বিয়ে শাদি করবে না? কেমনে চলবে? তোমারও তো অল্প বয়স!’
যিনি বলছেন তিনি অবলীলায় শিশুটির সামনে একথা বলে যাচ্ছেন। আর শিশুটির মেধায় রোপিত হয়ে যাচ্ছে ঘৃণা বীজ।
তো কী করবেন আপনি? বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দেবেন? সুন্দরী হয়েছেন এটা কি আপনার দোষ? নিজেকে ধ্বংস করবেন? কুৎসিত দেখানোর জন্য যা যা প্রয়োজন সব করবেন? বোরখা পরবেন?
কিন্তু পারবেন না কিছুই করতে। জোর করে আপনার মুখের ভেতর ঠেসে দেওয়া বিষ , না পারবেন আপনি গিলতে , না পারবেন ফেলতে। কটূস্বাদ নিয়েই চলতে হবে আপনাকে। কারণ সমাজ তখন আপনার ঘরেই ঢুকে গেছে। সমাজের মুখপাত্র আপনার কন্যা বলবে, এতোক্ষণ বাইলে ছিলে কেন? আড্ডা মারতে খুব মজা লাগে? পুরুষের ছোঁক ছোঁক দৃষ্টি খুব ভালো লাগে? ’
কী বলছি আমি এসব?
এসব আপনি জানেন। জানেন না কেবল সংবেদনশীল হতে। চলুন জেনে আসি বইটির গল্প। ফø্যাপে কী আছে? বলছি সংক্ষেপে।
মা মিলি আর কন্যা মিতুলের অদ্ভুত বিবমিষাময় সম্পর্কের টানাপোড়েনের গল্প এটি। মিলি নামের অপরূপ রূপসী এক নারীকে ঘিরে সমাজের নানা জটিলতা আর তার কন্যা মিতুলের মানসিক দ্বন্দ্ব।
অসম্ভব রূপবতী এক নারী মিলি। চারদিকে তাকানোর সময় কোথায়! নিজের সৌন্দর্যে বিমোহিত সে। আনন্দিত। উচ্ছ্বল, বন্ধু বৎসল- এক হাস্যোজ্জ্বল তরুণী। সেই মিলিকে এখন কাটাতে হয় নিজের রূপকে কতোভাবে আড়াল করে রাখা যায় সেই প্রচেষ্টায়। এক বখাটে তার জীবনকে টেনে নিয়ে এসেছে এই দুর্বিসহ পরিণতিতে । অস্ত্রের মুখে তাকে তুলে নিয়ে যায়। কালেমা পড়ে বিয়ে করে, তাকে দিনের পর দিন ধর্ষণ করে। খুবলে খুবলে যেন খেয়ে ফেলতে চায় মিলির সৌন্দর্য। দুঃসহ শারীরিক মানসিক নির্যাতনে অসুস্থ অবস্থায় মিলি উদ্ধার হয়। ক্রশফায়ারে মারা যায় বখাটে। জন্ম হয় হয় মিতুলের। চোখ খুলে মিতুলকে দেখে অজ্ঞান হয়ে যায় মিলি। হুবহু বখাটে মন্টুর মুখ ! দীর্ঘদিন চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ট্রমামুক্ত হয়। ফের জীবনের স্বপ্ন দেখতে থাকে সে।
তবে মিলির যেন দুর্ভোগের কাল শেষ হতে হতেও শেষ হয় না। একমাত্র আশ্রয় মা-বাবা। তাদেও মৃত্যুতে সে আশ্রয় হারায় সে। প্রতিনিয়ত কন্যাকে নিয়ে কথা শুনতে শুনতে পরিচিত পরিবেশ থেকে বান্দরবানে চলে আসে তারা। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক বান্ধবী থাকে। কন্যাকে স্কুলে ভর্তি করায়। নিজে কাজ শুরু করে। কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হলো না মিলির জীবনে। মিতুলকে নিয়ে কোথাও গেলে সবাই প্রশ্ন করতে থাকে- এ আপনার মেয়ে? বিশ্বাস হয় না।
আপনি এতো সুন্দর! মেয়ে কার মতো হয়েছে? বাবার মতো?
টিনএজ মিতুলের কাছে মায়ের সৌন্দর্য বিষের মতো লাগতে থাকে। সে নিজের ঘরে একা সময় কাটায়। খাবারও খায় নিজের ঘরে। ভালো ছবি আঁকে। কিন্তু মাকে দেখায় না। মা জানতে পারে স্কুলের শিক্ষকদের মাধ্যমে।
মিলি মেয়েকে খুশি করার জন্য নিজেকে বদলাতে থাকে। সব ছাড়তে থাকে। সব । আনন্দ, সাজ । মিলি প্রাণপণে মেয়েকে সহজ সুন্দর জীবন দিতে চায় । আর মেয়ে আরো দূরে আরো দূওে চলে যায়। এরই মাঝে মিতুলের দাদা বিষবৃক্ষের বীজ বপন করে দিয়েছে তার শিশুমনে। মা খারাপ। পুরুষদের আকর্ষণ করে। বাবা ভালো। মাকে বাঁচাতে গিয়েই তো বাবাটা মরে গেলো। অসহায় মিলি বুঝতে পারে না সে আসলে কী করবে? মরে যাবে? পালিয়ে যাবে? কোথায় যাবে? মেয়েটির কী হবে?
মাঝে মাঝে খুব সঙ্গোপনে মায়ের কাছে আসে মিতুল। মাকে আদর করে। অসুখ হলে সেবা করে। চমকে দিতে চায় ভালো রেজাল্ট করে, ভালো ছবি এঁকে। কিন্তু যখনই তার সামনে কেউ মাকে প্রশংসা করে ফেলে সে মুহূর্তে পাল্টে যায়। তখনই রাগ হতে থাকে তার। রাগ হলে তার অবচেতন মনের যতো কদর্য ভাবনা বের হয়ে আসে।
এইসব টানাপোড়েন নিয়ে মা-মেয়ের জীবন চলতে থাকে।
আহারে গোল্ডফিশ লাইফ!
অ্যাকুরিয়ামের দুটো গোল্ডফিশ যেমন ঘুরে ফিরে দ’ুজনকেই দেখে- দুটো মানুষ যখন একই ছাদের নিচে ঘুরে ফিরে দু’জনকেই দেখতে থাকে তখন তাদের এই গোল্ডফিশ ক্রাইসিস তৈরি হয়।
দেখতে চান কেমন ক্রাইসিস?
‘ মেয়ের সঙ্গে কয়েকটা দিন ভালোই যাচ্ছিলো। ফের সেতুহীন উত্তাল নদীতে নিমজ্জন ঘটল। মিতুলের হঠাৎ পেটে ব্যথা শুরু হলো। নিজ দায়িত্বে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ দিলাম। কিন্তু কমার লক্ষণ নেই। পরে রিকশা ডেকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। সেখানে আরও লোক ছিল। ডাক্তার যখন চেক করে তখন যথারীতি একজন প্রশ্ন করে, ও আপনার কে হয়?
আমার রোমকূপ শিরশির করে, অস্ফুটে বলি , কন্যা।
আপনার কন্যা? বেফাঁস হয়ে ওঠে লোকটি। ওর বাবা কি ওর মতো দেখতে?
আপনি থামবেন? আমি মৃদু ধমক দিয়ে একসময় মিতুলকে বাসায় নিয়ে আমি।
ততক্ষণে ডাক্তার মিতুলকে ওষুধ খাইয়ে দিয়েছেন। লোকটি তখনো ড্যাবড্যাবে চোখে কখনো মিতুলকে কখনো আমাকে দেখে যাচ্ছিলো।
আমার ভেতরটা ক্রমশ হিম হচ্ছিল, এই ব্যাপারটা নিয়ে মিতুল এর কী করে, তা নিয়ে।
যা ভেবেছিলাম।
পুরো রাস্তায় মুখে কুলুপ এঁটে বাড়ি ঢুকে মৃদু কণ্ঠে মিতুল প্রশ্ন করে , এইসব মুহূর্তগুলি তুমি খুব এনজয় করো, না?
কোন সব মুহূর্ত, ইচ্ছে করেই ভাণ করি।
আহা যেন জানো না, মিতুলের কণ্ঠ উত্তপ্ত হতে থাকে থাকে । তোমার এই ন্যাকামোগুলি আমার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।
ঘরের বাতিগুলোয় ফিউজ ফিউজ ভাব। ঘরটায় ছায়াচ্চন্নতা। যেন আলোহীনতা নয়, চারপাশ ঘিরে আছে বিষাদের ছায়া।
আমি নিশ্চুপ বসে থাকি।
পুরুষগুলো তোমাকে এসব বেশি বলে, আমি নিশ্চিত তুমি ভেতরে ভেতরে মজা পাও, তো বসে আছো কেন, একটা বিয়ে করে ফেললেই পারো।’’
আর বলবো না। বাকিটা আপনাকে পড়তে হবে। তার আগে জেনে নিন , নাসরীন জাহানের লেখা কেন পড়বেন?
নাসরীন জাহানের লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো চরিত্রের অভ্যন্তরীণ জগৎ, জটিল মনস্তত্ত্ব, দ্বন্দ্ব, মনোবিকলনের গভীর বিশ্লেষণ।
মিলি'র সৌন্দর্য তার মেয়ে মিতুলের কাছে 'বিষ' মনে হচ্ছে, আবার মাকে আঁকড়ে ধরছে। এই যে প্রেম, ঘৃণা, টানাপোড়েন এবং দোষারোপের মিশ্র অনুভূতি
নাসরীন জাহানই পারেন আলো ফেলে দেখাতে। সফলভাবে।
নাসরীন জাহানের কলমে সমাজের কটাক্ষে মিতুলের 'শত মাইল দূরে ছিটকে' যাওয়ার অনুভূতি, বা মায়ের 'দুঃসহ টর্চারের' পর ফিরে আসার বর্ণনা চরিত্রগুলির অভ্যন্তরীণ ক্ষয়, ক্লেদ, যন্ত্রণাকে তুলে ধরে। আর তাঁর লেখা যেন জাদুবাস্তবতার সূতিকাঘর। বাস্তবতা আর পরাবাস্তবতার মিশ্র আবহে এগিয়ে চলে কাহিনি। তাঁর চরিত্রগুলি বর্ণনার প্রেক্ষিতে প্রায়শ নতুন নতুন ব্যঞ্জনা তৈরি করে। যারা জীবন বাস্তবতা থেকে আলাদা নয় আবার কল্পলোক লোক থেকেও তাদের বিচ্ছিন্ন করা যাবে না।
‘সূর্যাস্তের শেষ রঙ’ প্রকাশ করেছে অন্য প্রকাশ। প্রকাশকাল ২০২০। বইটির দাম ২৫০ টাকা।
বই পড়–ন। সৌন্দর্যে বাঁচুন। জানেনই তো গরু-ছাগলও বেঁচে থাকে।
Add a Comment